ভারতকে উড়িয়ে সাবিনাদের দাপুটে জয়

ভারতকে উড়িয়ে সাবিনাদের দাপুটে জয়

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী ফুটবলের জয়যাত্রা দীর্ঘদিনের। সবুজ গালিচায় দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পর এবার ইনডোর বা ফুটসালের কোর্টেও নিজেদের আধিপত্যের জানান দিলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ফুটসাল টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিল সাবিনা-কৃষ্ণারা। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে শক্তিশালী ভারতকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে এক অবিস্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।


বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ব্যাংককের নোনথাবুরি হলে মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট হিসেবে পরিচিত ভারতকে শুরু থেকেই চাপে রাখে বাংলাদেশ। ফুটসালে বাংলাদেশের মেয়েদের এটিই ছিল প্রথম ম্যাচ। অনভিজ্ঞতা বা জড়তা কাটিয়ে শুরু থেকেই ছন্দময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং ফুটসালের মতো দ্রুতগতির খেলায় বাংলাদেশের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার প্রতীক।


ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত পাসের মাধ্যমে ভারতীয় রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে সাবিনা খাতুনের দল। খেলার সপ্তম মিনিটেই গোছালো এক আক্রমণ থেকে লিড নেয় বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন পাস বাড়িয়ে দেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রানী সরকারকে। কৃষ্ণার থেকে ফিরতি পাস পেয়ে ডি-বক্সের ভেতর দারুণ এক নিখুঁত ফিনিশিংয়ে লক্ষ্যভেদ করেন সাবিনা। এই গোলে ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় লাল-সবুজের দল।

ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর ভারত সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের রক্ষণভাগ ছিল জমাট। উল্টো ১৩তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে বাংলাদেশ। এবারও সেই চিরচেনা সাবিনা-কৃষ্ণা জুটি। ডান দিক থেকে কৃষ্ণার বাড়ানো কোনাকুণি পাস গোলমুখে থাকা সাবিনা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জালে জড়িয়ে দেন। অধিনায়কের এই জোড়া গোলে প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ।


বিরতির পর ভারত গোল শোধে মরিয়া হয়ে উঠলেও বাংলাদেশের গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডাররা ছিলেন সজাগ। ম্যাচের ৩১তম মিনিটে ব্যবধান ৩-০ করেন মাতসুশিমা সুমাইয়া। একটি কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা আক্রমণ থেকে বল পেয়ে একাই বল টেনে নিয়ে গিয়ে চমৎকার শটে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমে ভারতের ম্যাচে ফেরার আশা প্রায় ক্ষীণ হয়ে যায়। তবে খেলার একদম শেষ দিকে একটি গোল করে ব্যবধান ৩-১-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয় ভারত। কিন্তু তা পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।


মজার বিষয় হলো, ঠিক আগের দিনই সাফ পুরুষ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশের ছেলেরা। সেই ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ৪-৪ গোলে ড্র করেছিল বাংলাদেশ দল। ছেলেদের সেই না-পারা বা আক্ষেপের জায়গাটি যেন সুদে-আসলে মিটিয়ে দিলেন সাবিনা-কৃষ্ণারা। ভারতকে সরাসরি হারিয়ে তারা বুঝিয়ে দিলেন, ফুটসালে বাংলাদেশের মেয়েরা যে কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।


ভারতের বিপক্ষে এই জয়টি বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ভারত তাদের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপকে ১১-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা করেছিল। যারা মালদ্বীপের জালে ১১ গোল দিয়েছিল, সেই ভারতীয় আক্রমণভাগ বাংলাদেশের জমাট রক্ষণে এসে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এটি মূলত কোচ ও খেলোয়াড়দের সঠিক কৌশলের ফসল।


সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের এই আসরে মোট ৭টি দেশ অংশগ্রহণ করছে। টুর্নামেন্টটি আয়োজিত হচ্ছে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ প্রতিটি দল একে অপরের মুখোমুখি হবে। লিগ পর্ব শেষে টেবিলের শীর্ষে থাকা দলটিই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। ভারতের মতো বড় বাধা পার হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে এখন শিরোপার হাতছানি।

আগামী শনিবার (১৭ জানুয়ারি) নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। ভুটানকে হারিয়ে জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারলে শিরোপার দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে যাবে সাবিনা বাহিনী। অন্যদিকে, পুরুষ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ শুক্রবার মালদ্বীপের মোকাবিলা করবে।


বাংলাদেশে ফুটবল জনপ্রিয় হলেও ফুটসাল বা ইনডোর ফুটবলের চল খুব বেশি দিনের নয়। সাধারণত ছোট কোর্টে ৫ জন করে খেলোয়াড় নিয়ে এই খেলা পরিচালিত হয়, যেখানে গতি এবং বল নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মেয়েরা ঘাসের মাঠে নিয়মিত খেলে অভ্যস্ত হলেও কৃত্রিম কোর্টে ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে হারানো একটি বড় মাইলফলক। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেলে ফুটসালের বৈশ্বিক মানচিত্রেও বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে।

ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয় কেবল টুর্নামেন্টে ভালো অবস্থানের সংকেত দেয় না, বরং নারী ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংককের নোনথাবুরি হলে যে গর্জন বাংলাদেশের মেয়েরা শুরু করেছে, তার প্রতিধ্বনি এখন সারা দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে। এখন লক্ষ্য কেবল একটিই—সাফ ফুটসালের প্রথম শিরোপাটি বাংলার ঘরে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন