ক্যানসার চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক বিজয়

ক্যানসার চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক বিজয়: ইংল্যান্ডের হাজার হাজার রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অনুমোদন

প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এনএইচএস (NHS) ইংল্যান্ড। দেশটিতে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ প্রোস্টেট ক্যানসার রোগীদের জন্য এখন থেকে সুলভ হতে যাচ্ছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ‘অ্যাবিরেটেরোন’ (Abiraterone)। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত লড়াকু রোগী এবং একটি প্রথম সারির চ্যারিটি সংস্থার নিরলস প্রচারণার ফলস্বরূপ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইংল্যান্ডের হাজার হাজার পুরুষ এই চিকিৎসার সুযোগ পেতে চলেছেন।


২০২৩ সাল থেকেই ‘অ্যাবিরেটেরোন’ নামক এই ওষুধটি স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে এনএইচএস-এর আওতাভুক্ত ছিল। তবে এতদিন ইংল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে কেবল অত্যন্ত জটিল বা অন্তিম পর্যায়ের রোগীদের ক্ষেত্রেই এটি সীমিত আকারে ব্যবহৃত হতো। ক্যানসার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই বা ‘ম্যাটাস্ট্যাসিস’ হওয়ার আগেই যদি এই ওষুধ দেওয়া যায়, তবে রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইংল্যান্ডে ইতিপূর্বে এই সুবিধা না থাকায় একটি ‘ভৌগোলিক লটারি’ বা বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছিল। এখন থেকে ইংল্যান্ডের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহারের দ্বার উন্মোচিত হলো, যা প্রতি বছর শত শত প্রাণ বাঁচাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


‘প্রোস্টেট ক্যানসার ইউকে’ (Prostate Cancer UK) নামক চ্যারিটি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি বছর অন্তত ৭,০০০ পুরুষ এই নতুন চিকিৎসার সুবিধা ভোগ করবেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এর মাধ্যমে প্রায় ১,৪৭০ জন পুরুষ ক্যানসারের পরবর্তী ভয়াবহ পর্যায় বা জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন। এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, বছরে অন্তত ৫৬০ জন পুরুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য বিভাগ (NHS) নিশ্চিত করেছে যে, গত তিন মাসের মধ্যে শনাক্ত হওয়া অন্তত ২,০০০ পুরুষকে দ্রুত এই ওষুধের আওতায় নিয়ে আসা হবে।


অ্যাবিরেটেরোন মূলত ক্যানসার কোষের বিস্তার রোধে কাজ করে। প্রোস্টেট ক্যানসারের কোষগুলো বৃদ্ধির জন্য পুরুষ হরমোনের ওপর নির্ভর করে। এই ওষুধটি সেই প্রয়োজনীয় হরমোনের উৎপাদন বন্ধ করে দেয় অথবা কমিয়ে দেয়, ফলে ক্যানসার কোষগুলো খাদ্যহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এই পদ্ধতিতে রোগটি হাড় বা শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া (ম্যাটাস্ট্যাসিস) থেকে রক্ষা পায়।


ব্রাইটনের বাসিন্দা জাইলস টার্নার, যিনি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তিনিই এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে মূল কারিগরদের একজন। তিনি যখন জানতে পারেন যে স্কটল্যান্ড বা ওয়েলসে বাস করলে তিনি বিনা মূল্যে এই চিকিৎসা পেতেন, কিন্তু ইংল্যান্ডে হওয়ার কারণে তাকে প্রতি মাসে ২৫০ পাউন্ড ব্যয় করতে হচ্ছে, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। বিবিসি নিউজের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জনসাধারণের সামনে আনেন এবং শুরু করেন তাঁর সুদীর্ঘ প্রচারণা।

জাইলস বলেন, “আজকের এই খবরটি আমাদের বহু বছরের প্রচেষ্টার এক অসামান্য ফসল। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আমার মতো আরও হাজার হাজার পুরুষ এখন সমতার ভিত্তিতে এই চিকিৎসায় অ্যাক্সেস পাবেন। এটি হাজার হাজার পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গ হতে রক্ষা করবে।” তবে তিনি এটিও যোগ করেন যে, একটি বৈজ্ঞানিক ট্রায়ালে কার্যকর প্রমাণ পাওয়ার পরেও এই সুবিধা পেতে কেন তিন বছর অপেক্ষা করতে হলো, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।


অ্যাবিরেটেরোনের এই কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছিল ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘স্ট্যাম্পেড’ (STAMPEDE) নামক একটি সুবিশাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ-এর মতে, এই ওষুধের দুই বছরের নিয়মিত ব্যবহার ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি অর্ধেক কমিয়ে দেয় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ শতাংশ হ্রাস করে। ইউসিএল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গার্ট অ্যাটার্ড বলেন, “গবেষণায় স্পষ্ট দেখা গেছে যে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ে এই ওষুধ প্রদান করলে তা প্রাণ বাঁচাতে অনন্য ভূমিকা রাখে।”


বিগত বছরগুলোতে ওষুধের পেটেন্ট বা মালিকানা স্বত্ব নিয়ে জটিলতার কারণে ইংল্যান্ডে এটি অনুমোদিত হয়নি। ২০২২ সালে এই ওষুধের পেটেন্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি একটি সাধারণ বা ‘জেনেরিক’ ওষুধে পরিণত হয়। ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে নতুন করে স্বীকৃতির জন্য বড় অংকের খরচ করার অনীহা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এনএইচএস ইংল্যান্ড অন্যান্য ওষুধের খরচ বাঁচিয়ে সেই সাশ্রয়কৃত অর্থ দিয়ে ‘অ্যাবিরেটেরোন’ প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


এনএইচএস ইংল্যান্ডের ক্যানসার বিষয়ক জাতীয় ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর অধ্যাপক পিটার জনসন বলেন, “ক্যানসারের এই জীবনবর্ধক চিকিৎসা ইংল্যান্ডের রোগীদের নতুন বছরের এক বিশাল উপহার। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইংল্যান্ডের হাজার হাজার পুরুষ আরও দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন।” ব্রিটিশ স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “যারা প্রোস্টেট ক্যানসারের সাথে লড়াই করছেন, তাদের প্রতিটি দিন অত্যন্ত মূল্যবান। হাজার হাজার মানুষকে অতিরিক্ত কয়েক বছর জীবন উপহার দিতে এই ওষুধটি জাদুর মতো কাজ করবে।”


ইংল্যান্ডে সফলতার পর এখন লক্ষ্য উত্তর আয়ারল্যান্ড। ‘প্রোস্টেট ক্যানসার ইউকে’ ইতিমধ্যেই নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিকদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে যাতে সেখানেও দ্রুত একই নিয়ম চালু করা হয়। চ্যারিটি সংস্থাটির পক্ষ থেকে অ্যামি রিল্যান্স বলেন, “এটি হাজার হাজার মানুষের এক স্মরণীয় জীবন-রক্ষণ বিজয়। ইংল্যান্ডের পর এখন উত্তর আয়ারল্যান্ডের রোগীদের চিকিৎসার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার লড়াই আমাদের চলবে।”

সর্বোপরি, অ্যাবিরেটেরোনের সহজলভ্যতা শুধু এক খণ্ড আশার আলো নয়, এটি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াকু হাজার হাজার মানুষের প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাওয়ার এক মহতী সোপান। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ সবার দ্বারে পৌঁছে দেওয়াই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন