প্রযুক্তি বিশ্বে আইনি লড়াইয়ের নতুন মোড়

একচেটিয়া আধিপত্যের অভিযোগে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গুগলের আপিল: প্রযুক্তি বিশ্বে আইনি লড়াইয়ের নতুন মোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক | ওয়াশিংটন ডি.সি.

অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন জগতে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বা একচেটিয়া একাধিপত্য ধরে রাখার আইনি লড়াইয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। যুক্তরাষ্ট্রের একটি জেলা আদালতের ঐতিহাসিক ‘অ্যান্টিট্রাস্ট’ বা একচেটিয়া বিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপিল দায়ের করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের আগস্ট মাসে প্রদত্ত ওই রায়ে আদালত গুগলকে অনলাইন অনুসন্ধানে ‘অবৈধ একচেটিয়া কারবারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। গুগল এখন সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাবি করছে যে, আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে।


গুগলের পক্ষ থেকে আপিল করার পাশাপাশি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বা নিয়ন্ত্রক বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লি-অ্যান মুলহল্যান্ড শুক্রবার এক ঘোষণায় বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে যা বলে আসছি, ২০২৪ সালের আগস্টে দেওয়া আদালতের সেই রায়ে একটি কঠিন বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মানুষ গুগল ব্যবহার করে কারণ তারা এটি ব্যবহার করতে চায় বা পছন্দ করে, তারা এটি ব্যবহারে বাধ্য নয় বলে আমরা মনে করি।”

গুগলের ভাষ্যমতে, বর্তমান প্রযুক্তিবাজারে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অতিদ্রুত উদ্ভাবনের জোয়ার চলছে, জেলা জজ অমিত মেহতা তাঁর রায়ে সেটি পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। গুগল কর্তৃপক্ষ মনে করে, সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবন, কোনো অবৈধ চুক্তি বা জবরদস্তি নয়।


আদালতের রায়ের পর সেপ্টেম্বর মাসে জজ অমিত মেহতা গুগলকে তার একচেটিয়া ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষে কিছু বিশেষ ‘প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা’ বা সংশোধনী প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বাজার বিশ্লেষক এই নির্দেশগুলোকে ‘যথেষ্ট নমনীয়’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তবুও গুগল এগুলোর বাস্তবায়ন স্থগিত করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

জজ মেহতা তাঁর পর্যবেক্ষণে স্বীকার করেছিলেন যে, বর্তমানে জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) আবির্ভাব সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবসার গতিপথ বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনটি আইনি মামলার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে মার্কিন সরকারের সরকারি আইনজীবীদের পক্ষ থেকে গুগলকে বিভক্ত করার এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রাউজার ‘ক্রোম’ (Chrome) বিক্রি করে দেওয়ার (Spin-off) যে কঠোর দাবি তোলা হয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিচারক।

পরিবর্তে, তিনি কিছুটা সহজ পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল, আদালত কর্তৃক নির্ধারিত ‘যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের’ সাথে গুগলকে তাদের মূল্যবান তথ্য (Data) শেয়ার করতে হবে। এর মধ্যে গুগলের ‘সার্চ ইনডেক্স’-এর বড় একটি অংশও রয়েছে। উল্লেখ্য, এই সার্চ ইনডেক্স মূলত ইন্টারনেটের একটি বিশাল মানচিত্রের মতো কাজ করে, যেখানে কোটি কোটি ওয়েবসাইটের তথ্য জমা থাকে।


শুক্রবার গুগলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুলহল্যান্ড প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে সার্চ ডাটা এবং সিন্ডিকেশন পরিষেবা শেয়ার করতে বাধ্য করার নির্দেশের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, এমন পদক্ষেপ শুধুমাত্র সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার (Privacy) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে না, বরং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিজস্ব প্রোডাক্ট বা প্রযুক্তি তৈরিতে নিরুৎসাহিত করবে। তিনি তাঁর বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেন, “এই ধরনের ম্যান্ডেট উদ্ভাবনী শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তির অগ্রভাগে আমেরিকার যে অবস্থান রয়েছে, তাকে শেষ পর্যন্ত বিপন্ন করবে।”

গুগল মনে করছে, অন্যের তৈরি ইনডেক্স ব্যবহার করে যদি প্রতিযোগীরা সহজে কাজ চালিয়ে নিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেটে তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরির কোনো আগ্রহ বা উৎসাহ থাকবে না, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকে ধ্বংস করবে।


গুগল যখন একদিকে নিজ দেশে এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্ষেত্রেও কোম্পানিটি বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। তবে সেখানেও তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। গত মাসেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) গুগলের এআই সামারি বা ‘এআই ওভারভিউ’ ফিচারের ওপর একটি বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে। সাধারণত এই ফিচারে গুগল সার্চের একদম ওপরের অংশে ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংক্ষিপ্ত আকারে উত্তর দিয়ে দেয়।

ইউরোপীয় কমিশনের অভিযোগ হলো, গুগল বিভিন্ন ওয়েবসাইটের কন্টেন্ট বা ডাটা ব্যবহার করে এই এআই সেবা দিচ্ছে অথচ মূল প্রকাশক বা পাবলিশারদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা ক্রেডিট প্রদান করছে না। এর প্রতিক্রিয়ায় গুগল জানিয়েছে, প্রযুক্তিবাজারে উদ্ভাবনের ওপর এই ধরনের তদন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


আইনি ও নীতিগত হাজারো সংকটের মাঝেও গুগলের ব্যবসায়িক সাফল্যের চাকা থেমে নেই। এই সপ্তাহেই গুগলের মূল কোম্পানি ‘অ্যালফাবেট’ (Alphabet) একটি নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বিশ্বের চতুর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বাজার মূলধন (Market Capitalisation) অতিক্রম করেছে। একদিকে পাহাড় সমান আর্থিক সফলতা এবং অন্যদিকে ইতিহাসের বৃহত্তম ‘অ্যান্টিট্রাস্ট’ লড়াই—সব মিলিয়ে গুগল এখন এক দোলাচলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, গুগলের এই আপিলের রায় কেবল প্রতিষ্ঠানটির একার নয়, বরং ভবিষ্যতের সার্চ টেকনোলজি, ডাটা প্রাইভেসি এবং অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করে দিতে পারে। যদি শেষ পর্যন্ত আপিল আদালতে গুগল সফল হয়, তবে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল এক নতুন ভিত্তি পাবে। অন্যথায়, ডিজিটাল অর্থনীতিতে তথ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের যে চিরচেনা ধারা, সেখানে আমূল পরিবর্তন আসতে বাধ্য। বর্তমানে আইনি কার্যক্রম এবং সরকারি নজরদারি আরও কত দূর গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে প্রযুক্তি ও আইন বিশ্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন