মেলবোর্ন থেকে ঐতিহাসিক জয়ের লক্ষে জোকোভিচ

মেলবোর্ন থেকে ঐতিহাসিক জয়ের লক্ষে জোকোভিচ: ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম কি শুধুই সময়ের অপেক্ষা?

নিজস্ব প্রতিবেদক | স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্ব টেনিসের জীবন্ত কিংবদন্তি নোভাক জোকোভিচ আবারো একবার ইতিহাসের মুখোমুখি। আসন্ন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনকে কেন্দ্র করে টেনিস অঙ্গনে এখন একটাই আলোচনা—জোকোভিচ কি পারবেন মার্গারেট কোর্টকে ছাড়িয়ে এককভাবে ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের সর্বকালীন বিশ্ব রেকর্ড গড়তে? ৩৮ বছর বয়সি এই সার্বিয়ান তারকা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মার্গারেট কোর্টের সাথে সমানভাবে ২৪টি প্রধান শিরোপা নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছেন। ২০২৩ সালের ইউএস ওপেনে জয়ের পর থেকেই এই কাঙ্ক্ষিত ২৫তম ট্রফির অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। তবে এবারের মেলবোর্ন সফরের আগে নিজের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই কিংবদন্তি।


মেলবোর্ন পার্কে প্রতিযোগিতার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জোকোভিচ তার শান্ত ও ধীরস্থির মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়ার আগেই হয়তো এটিই তার ২৫তম শিরোপা জেতার শেষ এবং সেরা সুযোগ। কিন্তু জোকোভিচ এই ‘এখন নয় তো কখনও নয়’ (Now or never) তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তার মতে, এমন কঠোর মানসিকতা পারফরম্যান্সের ওপর ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে নেতিবাচক চাপই বেশি সৃষ্টি করে।

জোকোভিচ বলেন, “আমার ২৫তম শিরোপা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু আমি যা অর্জন করতে পারি সেটার চেয়ে যা আমি ইতোমধ্যেই অর্জন করেছি তার ওপর মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। যদি আমি ২৫তম ট্রফিটি জয় করতে পারি তবে সেটি হবে পরম সৌভাগ্যের। তবে ২৪ সংখ্যাটিও কিন্তু মন্দ নয়। আমাকে আমার অর্জনের প্রশংসা করতে হবে এবং মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমার ক্যারিয়ার কতটা অভাবনীয় ছিল।” মূলত কোর্টের সর্বকালের রেকর্ড ভাঙার যে অবচেতন চাপ তাকে তাড়া করছিল, তা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে খেলার চেষ্টাই করছেন এই রেকর্ড দশবারের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন চ্যাম্পিয়ন।


টেনিস বিশ্বের বর্তমান সমীকরণ জোকোভিচের জন্য আর আগের মতো সহজ নেই। গত বছর জোকোভিচ সবকটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের সেমিফাইনালে পৌঁছালেও, শিরোপাগুলো নিজেদের ঝুলিতে ভরেছেন তরুণ তুর্কি ইয়ানিক সিনার এবং কার্লোস আলকারাজ। গত আটটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের সবকটিই জিতেছে ২৪ বছর বয়সি সিনার অথবা ২২ বছর বয়সি আলকারাজ। এই নতুন প্রজন্মের আধিপত্যের মুখে ৩৮ বছরের জোকোভিচ এখনো কতটা টেকসই হবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।

মেলবোর্নে সোমবার রাতে রড লেভার এরিনায় স্পেনের পেদ্রো মার্টিনেজের বিরুদ্ধে নিজের অভিযান শুরু করবেন জোকোভিচ। দীর্ঘ বিশ্রামের পর মাঠে ফিরলেও শরীর কতটা সায় দেয়, সেটিও বড় চিন্তার কারণ। গত বছরের সেমিফাইনালে ইনজুরির কবলে পড়ে আলেকজান্ডার জভেরেভের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল তাকে। তবে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস এখনো হারাননি তিনি। জোকোভিচ দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “আমি জানি আমি যখন সম্পূর্ণ সুস্থ থাকি এবং খেলার প্রতিটি ছন্দে তাল মেলাতে পারি, তখন আমি বিশ্বের যেকোনো খেলোয়াড়কে পরাজিত করার ক্ষমতা রাখি। আমার যদি নিজের ওপর সেই দৃঢ় বিশ্বাস না থাকতো, তবে আজ আমি এখানে আসতাম না।”


টেনিস কোর্টের বাইরেও জোকোভিচ সমানে আলোচনায় রয়েছেন তার সাংগঠনিক কার্যকলাপের কারণে। ২০২০ সালে তিনি খেলোয়াড়দের অধিকার রক্ষার লক্ষে ‘প্রফেশনাল টেনিস প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (PTPA) গঠন করেছিলেন। তবে অতি সম্প্রতি তিনি এই সংগঠন থেকে সম্পূর্ণ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবকে দায়ি করে তিনি তার সরে দাঁড়ানোর কথা নিশ্চিত করেছেন।

জোকোভিচ মনে করেন, টেনিসের বর্তমান ব্যবস্থা খেলোয়াড়দের স্বার্থ পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। পিটিপিএ বর্তমানে বিভিন্ন বৈশ্বিক টেনিস সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টি-কম্পিটিটিভ’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আইনি লড়াই চালাচ্ছে। তবে এই আইনি লড়াইয়ে জোকোভিচ সরাসরি বাদী না হয়েও বারবার তার নাম সংগঠনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জোকোভিচ বলেন, “সংগঠনটি যেন সফল হয় সেই শুভকামনা আমার রইল, কারণ আমাদের টেনিস বাস্তুতন্ত্রে খেলোয়াড়দের জন্য একক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বর্তমানে সংগঠনের যে নেতৃত্ব এবং কর্মপন্থা, তা আমার আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”


অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের জন্য জোকোভিচ এবার চতুর্থ বাছাই হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। টেনিস বিশ্লেষকদের মতে, ওপেন এরা-র ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে তার সামনে। কিন্তু বাধা হিসেবে সামনে পাহাড়সম শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গতবারের চ্যাম্পিয়ন ইয়ানিক সিনার। অন্যদিকে কার্লোস আলকারাজের আগ্রাসী মেজাজও জোকোভিচের রেকর্ড জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, মেলবোর্ন পার্কে আগামী দুই সপ্তাহ কেবল টেনিসের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, বরং জোকোভিচের অপ্রতিরোধ্য মানসিকতা ও শারীরিক সহনশীলতার এক অগ্নিপরীক্ষা হবে। তিনি তার ২৪ বছরের দীর্ঘ পথচলায় যেমন বহুবার ফিরে এসেছেন ছাই চাপা আগুনের মতো, এবারও কি সেই আগুনের ফুলকি মেলবোর্নের আকাশে জ্বলে উঠবে? ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে যদি জোকোভিচ টেনিস ইতিহাসের শীর্ষবিন্দুতে আসীন হন, তবে সেটি হবে এক অনন্য ও মহাকাব্যিক জয়।

সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের নজর এখন সোমবারের সেই লড়াইয়ের দিকে, যেখানে অভিজ্ঞতা আর প্রতিভার সংঘর্ষে আবারো রোমাঞ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় টেনিস বিশ্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন