টানা ৫ ম্যাচে ‘ম্যাচসেরা’ শামসুন্নাহার জুনিয়র!

নারী ফুটবল লিগে অনন্য ইতিহাস: টানা ৫ ম্যাচে ‘ম্যাচসেরা’ শামসুন্নাহার জুনিয়র, ফরাশগঞ্জের শিরোপা অভিযাত্রা

দেশের ঘরোয়া ফুটবল অঙ্গনে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের এক নতুন এবং অবিশ্বাস্য নজির স্থাপিত হলো। জয়-পরাজয়ের সমীকরণে রেকর্ড গড়া ফুটবলে নতুন কিছু নয়, তবে টানা পাঁচ ম্যাচে ‘সেরা খেলোয়াড়’ হওয়ার কীর্তি বিরল বললেও কম বলা হয়। আর সেই মহাকাব্যিক ঘটনারই সাক্ষী হলো এবারের ‘বাংলাদেশ নারী ফুটবল লিগ’। ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের তারকা স্ট্রাইকার শামসুন্নাহার জুনিয়র আজ লিগের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে যেমন দলকে জয়ের ধারা সচল রেখেছেন, তেমনই নিজেকে নিয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে এক শিখরে।


শনিবার (১৭ জানুয়ারি, ২০২৬) বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এক রোমাঞ্চকর দ্বৈরথের মুখোমুখি হয় লিগের দুই শীর্ষ দল। ১১ দলের এই লিগে ফরাশগঞ্জ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী—উভয়ই এই ম্যাচের আগে পর্যন্ত অপরাজিত ছিল। সেনাবাহিনী জিতেছিল টানা ৫ ম্যাচ, আর ফরাশগঞ্জ জিতেছিল টানা ৪ ম্যাচ। শিরোপার অন্যতম দাবিদার এই দুই দলের লড়াইকে বিশেষজ্ঞরা অভিহিত করেছিলেন ‘লিগ ডিসাইডার’ ম্যাচ হিসেবে।

খেলার শুরু থেকেই আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে জমজমাট ছিল কমলাপুরের সবুজ গালিচা। মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা ও তহুরা খাতুনদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ফরাশগঞ্জ মধ্যমাঠে দাপট দেখালেও সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল রক্ষণব্যুহ ভাঙা সহজ ছিল না। তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে কোনো দল গোল না পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় ফরাশগঞ্জ। ৫৪তম মিনিটে সেনাবাহিনীর রক্ষণভাগের এক খেলোয়াড়ের মারাত্মক ভুলের সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগান শামসুন্নাহার জুনিয়র। বক্সের ঠিক সামনে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই বাঁ পায়ের দর্শনীয় শটে প্রথম বার লক্ষ্য করে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। গোলরক্ষক ঝাঁপিয়েও সেই গতির শট প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন। এই একটি মাত্র গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেয়।


ফরাশগঞ্জের জয়ের খবরের চেয়েও আজকের দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো শামসুন্নাহার জুনিয়ারের অবিশ্বাস্য একক পরিসংখ্যান। চলতি লিগে এ পর্যন্ত ফরাশগঞ্জ মোট ৫টি ম্যাচ খেলেছে, আর সেই ৫টি ম্যাচের প্রত্যেকটিতেই ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে তার হাতে। এর মধ্যে প্রথম ম্যাচে তিনি যৌথভাবে সেরা হলেও পরের চারটি ম্যাচে তিনি একক আধিপত্য বজায় রেখে সেরা নির্বাচিত হয়েছেন।

গোল করার দক্ষতার ক্ষেত্রেও তিনি যেন কোনো অতিমানবিক চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন। লিগের ৫ ম্যাচে তার বর্তমান গোলসংখ্যা ১৯! যেখানে লিগের অন্যতম শক্তিশালী দল সেনাবাহিনী তাদের গোলমুখ রক্ষা করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে, সেখানে তাদের জাল ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি আনা সহজ ছিল না। এর আগের দুই ম্যাচেও শামসুন্নাহার যেন অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। এমনকি চরম শারীরিক অসুস্থতা এবং প্রবল জ্বর নিয়ে মাঠের নেমে ৪টি গোল করার বীরত্বও তিনি প্রদর্শন করেছেন বিগত রাউন্ডে। স্ট্রাইকার হিসেবে গোলবক্সে তার ‘কিলার ইন্সটিঙ্কট’ কোচ এবং দর্শকদের মুগ্ধ করছে।


বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হারিয়ে ফরাশগঞ্জ এখন পয়েন্ট টেবিলের এক নম্বর অবস্থানে সুসংহত। দলের কোচ মনে করছেন, সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার মাধ্যমে শিরোপা জয়ের পথে থাকা সবচেয়ে বড় কাঁটাটি সরে গেল। ফরাশগঞ্জ স্কোয়াডে মারিয়া মান্দা বা মনিকা চাকমার মতো বিশ্বমানের দেশীয় তারকারা থাকায় দলগত সংহতি ছিল লক্ষ্যণীয়। সেনাবাহিনী রক্ষণভাগ যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও শামসুন্নাহারের গতির কাছে শেষ পর্যন্ত তারা হার মেনেছে।

তবে ফরাশগঞ্জের এই শিরোপা উৎসব এখনই পূর্ণতা পাচ্ছে না। লিগের পরবর্তী ম্যাচে তাদের লড়াই হবে ঋতুপর্ণা চাকমার শক্তিশালী দল ‘রাজশাহী স্টার্স’-এর বিপক্ষে। রাজশাহীও শিরোপার দৌড়ে পিছিয়ে নেই, তাই শামসুন্নাহার বনাম ঋতুপর্ণার সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচ দেখার জন্য এখন থেকেই ভক্তদের মনে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।


ম্যাচ শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শামসুন্নাহার জুনিয়র অত্যন্ত শান্ত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে কথা বলেন। টানা ৫ ম্যাচে সেরা হওয়ার কৃতিত্ব নিয়ে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জয় আমাদের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। শক্তিশালী একটি দলের বিপক্ষে গোল করে জয় নিশ্চিত করতে পারাটা অনেক বেশি ভালো লাগার। আজকের গোলটি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ তৃপ্ত কারণ সাধারণত হেডে বেশি গোল করি আমি, কিন্তু আজকেরটা ছিল বাঁ পায়ের একটি কঠিন শট। সেনাবাহিনীর বিপক্ষে কঠিন ম্যাচ বলেই গোলটি আমার কাছে ক্যারিয়ারের সেরার একটি।”

রেকর্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, টানা চারটি ম্যাচে ম্যাচসেরা হওয়ার পরই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটি একটি সম্ভাব্য রেকর্ড হতে যাচ্ছে। পঞ্চম ম্যাচেও সেরা হয়ে নিজেকে ছাপিয়ে যেতে পারাটা তার আগামী দিনের প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।


বাংলাদেশ নারী ফুটবলের অগ্রগতি যে সঠিক পথেই আছে, তা শামসুন্নাহারের মতো প্রতিভার প্রকাশ দেখেই অনুমেয়। ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদী পেশাদার লিগের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়েও বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। শামসুন্নাহারের এই অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত ফর্ম কেবল তার ক্যারিয়ারেই নয়, বরং জাতীয় দলের জন্য আগামীর স্বপ্ন পূরণে রসদ যোগাবে। ভক্তদের এখন একটিই প্রতীক্ষা—বাকি ম্যাচগুলোতে এই অপ্রতিরোধ্য স্ট্রাইকার তার গোলের নেশা কোথায় নিয়ে থামান এবং ফরাশগঞ্জ তাদের কাঙ্ক্ষিত ট্রফি হাতে ঘরে ফিরতে পারে কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন