বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সঙ্গেই তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে। বিএনপি মনে করে, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে এই কমিশন সম্পূর্ণভাবে সক্ষম হবে।
আজ সোমবার (২০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে এদিন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ হাজারো কর্মী-সমর্থক তাদের নেতার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোনাজাতে অংশ নিতে সমবেত হন।
সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিভিন্ন প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল, দলীয় প্রার্থিতা ও পোস্টাল ব্যালটসহ নানাবিধ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে অনেক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মনোনয়নপত্র বাছাই প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা বা আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা খুবই স্বাভাবিক বিষয় এবং এটি নতুন কিছু নয়। আমরা এখন পর্যন্ত যেটুকু পর্যবেক্ষণ করেছি, তাতে দেখা যাচ্ছে বর্তমান কমিশন তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো গতকাল কমিশনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। মহাসচিবের মতে, ‘আমাদের যে ছোটখাটো সমস্যাগুলো ছিল, তা আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছি। তাদের সামগ্রিক কার্যক্রমে আমরা বিশ্বাস ফিরে পেয়েছি। বিএনপি মনে করে, যোগ্যতার সঙ্গে তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করে জাতিকে একটি কাঙ্ক্ষিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ উপহার দিতে পারবে।’
মাঠপর্যায়ে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন থাকলেও ফখরুল তা উড়িয়ে দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমাদের দলের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের পরিবেশ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষ অভিযোগ নেই।’
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দীর্ঘ বক্তব্যে আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান কেবল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার। তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বের করে তিনি এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন।’
মহাসচিব বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে জিয়াউর রহমান জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন। সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি দেশে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলেন। সে সময়ের আন্তর্জাতিক মহলে কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন শহীদ জিয়া। তাঁর সময়কালেই কৃষি বিপ্লব, শিল্পায়ন এবং প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈদেশিক রেমিট্যান্স আয়ের মূল ভিত্তিগুলো শক্তিশালী হয়েছিল।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে ভেঙে পড়েছে এবং অর্থনীতি পুনরায় সংকটে নিমজ্জিত। এই অবস্থায় বিএনপির নেতাকর্মীরা জিয়াউর রহমানের সমাধিস্তম্ভে দাঁড়িয়ে একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার নতুন শপথ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর সকল অঙ্গসংগঠন দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে একটি সুন্দর আগামীর পথে যাত্রা শুরু করেছে। শহীদ জিয়ার সেই হারানো গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের লড়াই চলবে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হওয়া পর্যন্ত।’
এদিন শ্রদ্ধা নিবেদনকালে মহাসচিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাসসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও যুবদল, ছাত্রদল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের বিশাল জনসমাবেশ এদিন জিয়া উদ্যান প্রাঙ্গণে এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে। মোনাজাতে দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং নির্বাচন পর্যন্ত দলের ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি আবারও পুনরাবৃত্তি করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের কর্মস্পৃহা দেখাচ্ছে এবং তাতে বিএনপি সম্পূর্ণ আস্থাশীল।
