বিনিয়োগ সরাচ্ছেন বিদেশিরা, রেকর্ড অবনমনে রুপি

টানা দরপতনে ভারতের শেয়ারবাজার: বিনিয়োগ সরাচ্ছেন বিদেশিরা, রেকর্ড অবনমনে রুপি

ভারতের পুঁজিবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার—উভয় ক্ষেত্রেই এক গভীর অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (এফআইআই) ধারাবাহিকভাবে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন, অন্যদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রা ‘রুপি’র দরপতন ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ২০২৫ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের শুরুতেও এই সংকট অব্যাহত থাকায় ভারতের নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।


ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেডের (এনএসডিএল) সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫ সালটি ছিল ভারতের শেয়ারবাজারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি বছর। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি রুপির শেয়ার বিক্রি করে সেই অর্থ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল, নতুন বছরের শুরুতে বাজারের চিত্র কিছুটা পাল্টাবে; কিন্তু বাস্তবতা সেটির সম্পূর্ণ উল্টো। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম দুই থেকে আড়াই সপ্তাহেই আরও ২২ হাজার ৫৩০ কোটি রুপির বিনিয়োগ বাজার থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের এই বিশাল শূন্যতা ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন ভারতের স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির ধাক্কা সামাল দিতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশীয় সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড। বছরের এই সামান্য সময়েও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে ৩৪ হাজার ৭৬ কোটি রুপি লগ্নি করেছেন। স্থানীয় এই বিপুল অর্থের সঞ্চালন না থাকলে ভারতের সেনসেক্স এবং নিফটি সূচক বড় ধরনের ধসের সম্মুখীন হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।


পুঁজিবাজারের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও। দীর্ঘ কয়েক মাসের টানাপোড়েন শেষে গত ডিসেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির মান ৯০-এর ঘরে পৌঁছে যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে রুপির মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৯০ দশমিক ৮৯-এ গিয়ে দাঁড়ায়। গতকাল রবিবার বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও তা ৯০ দশমিক ৮৭ রুপিতেই অবস্থান করছিল।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় রুপির মোট অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। এর ফলে এশিয়ার বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে দুর্বল মুদ্রার তকমা পেয়েছে রুপি। মজার বিষয় হলো, রুপি কেবল মার্কিন ডলারের কাছেই পর্যুদস্ত নয়; বরং ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন এবং এমনকি প্রতিবেশী দেশ চীনের ইউয়ানের বিপরীতেও নিজের মান হারিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেটানো ভারতের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।


অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চলে যাওয়া এবং রুপির পতনকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখছেন। বিদেশি বিনিয়োগ সরে যাওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণকে শনাক্ত করেছেন তাঁরা।

প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাণিজ্যচুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের বাণিজ্য নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসায় চুক্তিটি ঝুলে আছে। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনে কথা বললেও কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ পাওয়া যায়নি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির ভারত সফরও তেমন কোনো সমাধান দিতে পারেনি, যা আন্তর্জাতিক মহলে অনিশ্চয়তার সংকেত পাঠাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, রুপির অবমূল্যায়নের ফলে বিদেশিরা মনে করছেন তাঁদের মুনাফা কমে যাচ্ছে। রুপির দাম কমে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার থেকে লব্ধ মুনাফা ডলারে রূপান্তর করার সময় কম ডলার হাতে পাচ্ছেন। একারণে তাঁরা ভারতের মতো উদীয়মান বাজার থেকে পুঁজি সরিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল উন্নত দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া ভারতীয় আমদানিকারকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ডলার কেনার চাহিদাও বাজারে মার্কিন ডলারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রুপির দাম কমিয়ে দিচ্ছে।


যদিও বর্তমান পরিস্থিতি অন্ধকারচ্ছন্ন দেখাচ্ছে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে ভারত নিয়ে আশাবাদী বহু বিশেষজ্ঞ। অনেক বাজার-বিশারদের মতে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে ভারতে আবার বিদেশি বিনিয়োগ ফিরতে পারে। ভারতের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণভাবে এখনো বেশ চাঙ্গা। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশৃঙ্খল মুনাফা প্রবৃদ্ধিকে তাঁরা তুরুপের তাস মনে করছেন। যখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা কাটবে এবং ডলারে বিপরীতে রুপির মান স্থির হবে, তখনই বিদেশিরা আবার ভারতের সেনসেক্স এবং নিফটির দিকে ঝুঁকবেন।

ততক্ষণ পর্যন্ত এই টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নীতিনির্ধারকদের। বাজারের তারল্য রক্ষা এবং মুদ্রা বাজারকে শক্তিশালী করতে নতুন কোনো বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা না আসা পর্যন্ত হয়তো রুপির লড়াই আরও কিছুটা দীর্ঘ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন