গাজায় থামছে না লাশের মিছিল: ৩ সাংবাদিকসহ ১১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৩ সাংবাদিকসহ ১১ জন নিহত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ড গাজায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ চললেও থামছে না রক্তক্ষয়। গতকাল বুধবার ভোর থেকে নতুন করে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মস্পর্শী এই প্রাণহানির তালিকায় রয়েছে দুই শিশু এবং তিন পেশাদার ফটো সাংবাদিক। এছাড়া পৃথক হামলায় আরও অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ফের বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।


বুধবারের হামলায় সবচাইতে আলোচিত এবং বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটেছে মধ্য গাজার নেতজারিম করিডরের কাছাকাছি। সেখানে তথ্য সংগ্রহের কাজ করার সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনজন ফিলিস্তিনি ফটো সাংবাদিক নিহত হন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন—আনাস ঘুনাইম, আবদুল রাউফ শাথ এবং মোহাম্মদ কেশতা।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, নিহত সাংবাদিকরা সবাই একটি বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে দায়িত্বরত ছিলেন। তারা গাজায় মিসরের ত্রাণ কার্যক্রম তদারককারী সংস্থা ‘ইজিপশিয়ান কমিটি ফর গাজা রিলিফ’-এর হয়ে কাজ করছিলেন। তারা মূলত উপত্যকায় নবনির্মিত অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরগুলোর তথ্য এবং চিত্র ধারণ করতে গিয়েছিলেন।

সংস্থার মুখপাত্র মোহাম্মদ মানসুর অভিযোগ করেছেন, যে গাড়িটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে তাদের সংস্থার বলে চিহ্নিত ছিল এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল। অথচ নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এই হামলাটি চালানো হয়েছে। হামলার সময়কার ভাইরাল হওয়া একটি ফুটেজে দেখা গেছে, বোমা ও মিসাইলের আঘাতে গাড়িটি সড়কের পাশে বিধ্বস্ত এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে তখনো ধোঁয়া উড়ছিল, যা এই হামলার ভয়াবহতা প্রকাশ করে।


সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক রহস্যময় বিবৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তাসূত্রগুলো দাবি করছে যে গাড়িটি সামরিক ড্রোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছিল। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, যাত্রীরা ড্রোন ব্যবহার করে গোয়েন্দাগিরি করছিল বলেই বিমান হামলাটি চালানো হয়েছে। তবে নিহত সাংবাদিকদের হাতে থাকা ক্যামেরা বা সরঞ্জামাদি আদৌ সামরিক ড্রোন ছিল কি না, তা নিয়ে ফিলিস্তিনি এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোর মতে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের এভাবে ‘শত্রুপক্ষ’ হিসেবে গণ্য করা যুদ্ধাপরাধের শামিল।


সাংবাদিকদের ওপর হামলার পাশাপাশি গতকাল বুধবার মধ্য গাজার অন্য এক অঞ্চলে একই পরিবারের ওপর আঘাত হেনেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে নিহত হয়েছেন এক ফিলিস্তিনি বাবা, তার নাবালক পুত্র এবং অন্য একজন নিকটাত্মীয়। এর বাইরে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় এক মর্মান্তিক দৃশ্য তৈরি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর কোনো উসকানি ছাড়াই ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী এক স্থানে ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কোনো কারণ ছাড়াই পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, উত্তর গাজায় চালানো ইসরায়েলি পৃথক দুই হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির চিত্র প্রমাণ করে যে, যুদ্ধবিরতির কাগজ-কলমের হিসাব গাজার বাস্তবের চিত্র পাল্টাতে পারেনি।


গত বছর ১০ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যস্থতায় গাজায় একটি বহু আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপে চলার কথা থাকলেও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েল প্রতিনিয়ত চুক্তির শর্তাবলি লঙ্ঘন করছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এই তিন মাসে অন্তত ৪৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশিই বেসামরিক নাগরিক এবং ত্রাণকর্মীরা রয়েছেন। শান্তিরক্ষার পরিবর্তে ইসরায়েলি অবরোধ এখন ত্রাণ সরবরাহ রুখে দেওয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ।


শীতাতপ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গাজার পরিস্থিতি এখন অমানবিক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। ২২ লক্ষাধিক মানুষ এখন কোনো স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া মানবেতর জীবন যাপন করছেন। খাদ্য এবং ওষুধের ভয়াবহ সংকট চরমে। বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ চললেও ইসরায়েলি পক্ষ থেকে এখনো গাজায় প্রয়োজনীয় খাদ্য, জ্বালানি এবং শীতকালীন জরুরি সামগ্রী প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে রাখা হয়েছে।

শীতকালীন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্প এখন কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় উষ্ণ কাপড়ের অভাব এবং পুষ্টিকর খাবারের সংকটে রোগব্যাধি বাড়ছে দ্রুত। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে সাংবাদিকদের টার্গেট করা এবং শিশুদের প্রাণহানি ঘটতে থাকলে প্রস্তাবিত শান্তি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস) কোনো কাজ করতে পারবে না। শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এই নিয়ন্ত্রণহীনতা ও চুক্তি লঙ্ঘনের প্রবণতা বন্ধ হওয়ার ওপর।

যুদ্ধবিরতির নামে চলমান এই সংঘাতকে অনেকেই ‘শীতল যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করছেন। গাজার বর্তমান আকাশ এবং ভূমির চিত্র যেন সেই করুণ ও অস্থির অবস্থার নীরব সাক্ষী। সারা বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে মার্কিন প্রস্তাবিত সেই বড় পরিকল্পনার জন্য, যেখানে শান্তি তদারকির মাধ্যমে এই নিষ্ঠুর রক্তক্ষয়ের অবসান ঘটতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন