দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সুকে ২৩ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছেন সিউলের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত। ২০২৪ সালের শেষের দিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলের সেই বিতর্কিত এবং নাটকীয় সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টায় সরাসরি সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিযোগে তাঁকে এই কঠোর সাজা প্রদান করা হয়।
বুধবার সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল ৭৬ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেন। জাতীয় টেলিভিশনে এই রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রিজাইডিং বিচারক লি জিন-কওয়ান তাঁর রায়ে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হান ডাক-সুর ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন রক্ষা করা। কিন্তু তিনি সেই পবিত্র দায়িত্ব ভঙ্গ করে দেশের সংবিধানকে ভূলুণ্ঠিত করতে স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন।”
আদালত এই সামরিক আইন জারির ঘটনাকে কেবল একটি ভুল পদক্ষেপ নয়, বরং একটি ‘পরিকল্পিত অভ্যুত্থান’ বা ‘ইনসারেকশন’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল আকস্মিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারি করেন। তিনি দেশের জাতীয় সংসদ বা ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’কে একটি পঙ্গু দানব হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং দেশের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে পার্লামেন্ট ভবনে সৈন্য পাঠান।
প্রেসিডেন্ট ইউন অভিযোগ তুলেছিলেন যে, বিরোধীরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং তারা প্রশাসনের কার্যক্রম স্থবির করে দিয়েছে। বিচারক লি জিন-কওয়ান বলেন, হান ডাক-সু এই পরিকল্পনায় মূল সহযোগী ছিলেন। প্রসিকিউশন পক্ষ এই মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় হানের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড দাবি করলেও বিচারক প্যানেল মনে করেন যে তাঁর অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় আরও কঠোর সাজা আবশ্যক। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, হান জানতেন এই সামরিক আইন সফল হলে দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশক পেছনে গিয়ে একটি ভয়াবহ একনায়কতন্ত্রের কবলে পড়বে। তবুও নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার আশায় তিনি গণতন্ত্র ধ্বংসের এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন।
মামলার শুনানিতে উঠে আসে আরও সব বিস্ফোরক তথ্য। জানা গেছে, সামরিক আইন জারির সেই রাতেই একটি ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক আয়োজনে মূল ভূমিকা পালন করেন হান। সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক আইন জারি করতে গেলে মন্ত্রিসভায় সেটি নিয়ে আলোচনা করতে হয়। ক্যাবিনেটের অধিকাংশ সদস্য সেই রাতেই সই করতে অস্বীকৃতি জানালে হান ডাক-সু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিলে তথাকথিত বৈঠকের কার্যবিবরণী ও বৈধতার দলিলাদি জাল করেছিলেন বলে আদালত প্রমাণিত বলে সাব্যস্ত করেছেন।
পাশাপাশি, ইউন সরকারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কণ্ঠরোধ করতে ভয়াবহ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। আদালতের তথ্যমতে, সেই রাতে হান ডাক-সু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সেসব গণমাধ্যমের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে সরাসরি লিপ্ত ছিলেন, যা নাগরিক অধিকারের ওপর একটি চরম কুঠারাঘাত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে হান দাবি করেছিলেন যে, সামরিক আইন জারির বিষয়বস্তু তিনি সেই রাতেই প্রথম শুনেছিলেন এবং তিনি প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু আদালতের নিবিড় তদন্ত ও গোপন ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে অন্য দৃশ্য। দেখা গেছে, সামরিক আইন সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর দলিলাদি তিনি নিজ হাতে গ্রহণ করছেন এবং নিজের পকেটে লুকিয়ে রাখছেন। এ কারণে তাঁকে আদালতে ‘মিথ্যা সাক্ষ্যদান’ বা ‘পারজারি’র অভিযোগে আলাদাভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী হানের কারাদণ্ড যেন এক বিশাল তুষারপাহাড়ের উপরিভাগ মাত্র। এই সামরিক বিদ্রোহের মূল নায়ক বা ‘রিং লিডার’ সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলের বিচারের রায় ঘোষিত হবে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা ইতিপূর্বেই বিদ্রোহ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে ইউন সুক ইয়োলের জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’ দাবি করেছেন। ফলে গোটা বিশ্বের দৃষ্টি এখন সিউলের আদালতের পরবর্তী রায়ের ওপর নিবদ্ধ।
হানের কারাদণ্ড হওয়ার সাথে সাথে এজলাসেই তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন শেষ কোনো কথা আছে কি না। ম্লান চেহারায় ৭৬ বছর বয়সী হান তখন নিচু স্বরে উত্তর দেন, “আমি আদালতের রায় সবিনয়ে মেনে নিচ্ছি।” উল্লেখ্য, হানের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার জন্য এক সপ্তাহ সময় পাবেন।
এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া প্রমাণ করেছে যে, দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে পদ বা বয়স—কিছুই শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারে না। ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ সালের সেই মাত্র ছয় ঘণ্টার দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি দেশটিকে ইতিহাসের অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারেনি জনগণের প্রতিরোধ আর আজ সেই অবিচারকারীদের চূড়ান্ত পরিণতির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্র আরও সংহত হলো বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
