ভারতের কর কাঠামো এবং বিদেশি বিনিয়োগ নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে কর ফাঁকি সংক্রান্ত একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ের পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ ৬০টি স্টার্টআপের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তারা দিল্লি সরকারকে বিনিয়োগ নীতি স্পষ্ট করার জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছে, যাতে এই রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরনো বিনিয়োগগুলোতে অযথা আইনি তল্লাশি না চালানো হয়।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ আদালতের ওই রায়ে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ওয়ালমার্টের কাছে ফ্লিপকার্টের ১.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে মরিশাসভিত্তিক যে সত্তাগুলোকে টাইগার গ্লোবাল ব্যবহার করেছিল, সেগুলো ছিল মূলত কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ‘মাধ্যম’ (Conduits)। আদালত মনে করছে, ভারত ও মরিশাসের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কর চুক্তির (India-Mauritius Treaty) সুযোগ নিয়ে কর এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। যদিও টাইগার গ্লোবাল প্রথম থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে যে, তারা চুক্তির নিয়ম মেনেই কর সুবিধা গ্রহণ করেছিল।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কয়েক বছরের পুরোনো এবং জটিল ‘ট্যাক্স প্ল্যানিং’ বা কর পরিকল্পনার বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশীয় কর ফাঁকি বিরোধী আইন (GAAR) দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধার ওপরে প্রাধান্য পেতে পারে—যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ‘স্টার্টআপ পলিসি ফোরাম’-এর সিইও শ্বেতা রাজপাল কোহলি গত ২০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি জরুরি চিঠি দিয়েছেন। রয়টার্সের পর্যালোচনায় আসা ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, “আদালতের এই রায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। এর ফলে ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকূল প্রভাব পড়তে পারে।” এই প্রতিনিধি দলে দেশের খ্যাতনামা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘মিশো’ (Meesho), বিমা খাতের ‘একো’ (Acko) এবং জনপ্রিয় খাদ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ‘সুইগি’র (Swiggy) মতো বড় বড় নাম রয়েছে।
চিঠিতে স্টার্টআপদের এই গোষ্ঠীটি সরকারের কাছে একগুচ্ছ দাবি পেশ করেছে। তাদের মূল চাওয়া হলো, ২০১৭ সালের আগে হওয়া বিনিয়োগগুলো যাতে নতুন করে কর তদন্তের মুখোমুখি না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত একটি সরকারি স্পষ্টীকরণ বা নির্দেশনা (Clarification) জারি করা।
২০১৭ সালে ভারত ও মরিশাসের কর চুক্তি হালনাগাদ করার সময় ভারত সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ওই সময়ের আগের বিনিয়োগগুলোকে সুরক্ষাকবচ বা ‘গ্র্যান্ডফাদারিং’ (Grandfathering) সুবিধা দেওয়া হবে। এখন আদালত যদি চুক্তির সুবিধা এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা দেয়, তবে সেই পুরনো বিনিয়োগগুলোর ভবিষ্যত কী হবে, তা নিয়েই মূল অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। স্টার্টআপ ফোরাম চাইছে, সরকার যাতে স্পষ্ট করে দেয় যে বিনিয়োগের স্থিতিশীল পরিবেশ রক্ষায় ভারত এখনো বদ্ধপরিকর।
ভারতের বিদেশি বিনিয়োগের ইতিহাসে মরিশাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছরে মরিশাস থেকে আসা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) পরিমাণ প্রায় ১৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি উক্ত সময়ের মোট বিনিয়োগ প্রবাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ। সুতরাং, মরিশাস রুট থেকে আসা বিনিয়োগ যদি আইনি মারপ্যাঁচে আটকে পড়ে, তবে তা ভারতের মোট অর্থনীতির জন্য বড় একটি ঝুঁকি হতে পারে।
রয়টার্স এই চিঠির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য জানতে চাইলেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভারতের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এন ভেঙ্কটরামন গত শুক্রবার বিনিয়োগকারীদের এই উদ্বেগ অনেকটা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “টাইগার গ্লোবালের রায়ে বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে বলে যে গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে, তা আসলে বিভ্রান্তিকর।” তাঁর মতে, কর আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ ব্যাহত হবে না।
তবে কর বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন মত পোষণ করছেন। তাদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরিধি অনেক বিস্তৃত হতে পারে। কারণ যদি একবারে নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগকে ‘শেল কোম্পানি’ বা ‘মাধ্যম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবে একই ধরনের শত শত বড় বড় চুক্তির ভিত্তি নড়ে যাবে। এটি ভারতের মতো ক্রমবর্ধমান স্টার্টআপ বাজারের জন্য হুমকিস্বরূপ, যা অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ববাজারের পুঁজিনির্ভর।
ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে স্বচ্ছ কর নীতি নিশ্চিত করা সরকারের লক্ষ্য, অন্যদিকে বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত একটি ‘স্থির বিনিয়োগ পরিবেশের’ প্রতীক হিসেবে পরিচিত হতে চায়। টাইগার গ্লোবালের এই মামলা এবং পরবর্তী সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তির চেয়ে ঘরোয়া কঠোর আইনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত একটি সন্তোষজনক স্পষ্টীকরণ না দেয়, তবে ২০২৬ সালে নতুন বিদেশি পুজির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
মিশো এবং সুইগির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো যারা ভবিষ্যতে শেয়ার বাজারে আইপিও ছাড়ার পরিকল্পনা করছে, তাদের জন্য কর স্থিতিশীলতা অত্যাবশ্যক। ভারতের বিনিয়োগ মহলে এখন একটাই প্রার্থনা—আইন যেন উন্নয়নের পথে অন্তরায় না হয়।
