একটি সুন্দর ও প্রাণখোলা হাসি মানুষের ব্যক্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুস্থ ও ঝকঝকে দাঁত কেবল সামাজিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং এটি আমাদের শারীরিক সুস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকও বটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মুখগহ্বরকে বলা হয় ‘শরীরের প্রবেশদ্বার’, কারণ দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্য সারা শরীরের সুস্থতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, আমাদের যাপিত জীবনের অনেক সাধারণ এবং ছোট ছোট অভ্যাস আমাদের অজান্তেই দাঁতকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলছে।
দাঁতের ক্ষতি সাধারণত কোনো তীব্র যন্ত্রণার মাধ্যমে শুরু হয় না, বরং এটি একটি মন্থর বা শ্লথ প্রক্রিয়া। এই নীরব অবক্ষয়ের ফলে যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। ‘বাংলা রয়টার্স’-এর আজকের প্রতিবেদনে আধুনিক জীবনযাত্রার এমন ৫টি দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, যা আপনার অজান্তেই দাঁতকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে।
১. অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে দাঁত মাজা: ‘পরিচ্ছন্নতা বনাম যুদ্ধ’
অনেক মানুষ একটি ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন যে, যতটা জোর প্রয়োগ করে বা ঘষে দাঁত মাজা যাবে, দাঁত তত বেশি পরিষ্কার ও ঝকঝকে হবে। দন্ত চিকিৎসকদের মতে, এটি দন্ত স্বাস্থ্য বিধির অন্যতম একটি প্রধান ত্রুটি। দাঁতের সবচেয়ে বাইরের সাদা এবং অত্যন্ত শক্ত আবরণটিকে বলা হয় ‘এনামেল’। এনামেল মানবশরীরের অন্যতম কঠিন পদার্থ হলেও অতিরিক্ত বল প্রয়োগের ফলে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।
জোরে ব্রাশ করার ফলে যখন এনামেলের স্তরটি পাতলা হয়ে যায়, তখন দাঁত অতিমাত্রায় ‘সংবেদনশীল’ বা সেনসিটিভ হয়ে পড়ে। ফলে ঠান্ডা বা গরম কোনো খাবার খেলে দাঁতে এক তীব্র শিরশিরানি অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, নরম দাঁতব্রাশ বা ‘সফট ব্রিস্টলস’ ব্যবহার করে আলতো হাতে চক্রাকার পদ্ধতিতে দাঁত মাজা উচিত। মনে রাখতে হবে, দাঁত মাজা মানে পরিষ্কার করা, ঘষে এনামেল তুলে ফেলা নয়।
২. এনামেলের শত্রু: অ্যাসিডিক খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা চা, কফি, কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব পানীয়তে থাকা উচ্চমাত্রার চিনি এবং কৃত্রিম অ্যাসিড দাঁতের এনামেলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে। যখন আমরা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাই, তখন মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া সেই চিনি থেকে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড দাঁতের উপরিভাগ থেকে ক্যালসিয়াম হরণ করে এবং এনামেলকে ক্ষয় করে দেয়, যাকে ‘ডিমিনারেলাইজেশন’ বলা হয়।
প্রতিদিন নিয়মিতভাবে কোল্ড ড্রিংক বা কফি খাওয়ার ফলে দাঁতের বর্ণ তো ফিকে হয়ই, সেই সাথে তৈরি হয় গভীর ক্যাভিটি। এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো, যখনই এই ধরনের পানীয় বা টক জাতীয় খাবার খাওয়া হবে, সাথে সাথেই সাধারণ পানি দিয়ে কুলকুচি বা মুখ ধুয়ে ফেলা আবশ্যক, যাতে অ্যাসিড দাঁতে স্থায়ী আসন গড়তে না পারে।
৩. পানিশূন্যতা ও লালার ভূমিকা হ্রাস
লালা বা ‘স্যালিভা’ (Saliva) আমাদের মুখের ভেতরের এক প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক। এটি মুখের ভেতরের অম্লত্ব বা অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে এনামেলকে সুরক্ষা দেয় এবং জমে থাকা খাবারের কণাগুলো পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। কিন্তু যখন আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করি না, তখন মুখ শুকিয়ে যায় বা লালা কম উৎপন্ন হয়।
চা, কফি বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন জাতীয় খাবার শরীরের জলীয় অংশ কমিয়ে দেয়। লালার পরিমাণ কমে গেলে মুখের ভেতর অ্যাসিডিক পরিবেশ তৈরি হয়, যা ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলস্বরূপ দাঁত দ্রুত দুর্বল হতে থাকে। তাই সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা কেবল ত্বকের জন্যই নয়, বরং মাড়ি ও দাঁতের দীর্ঘায়ুর জন্যও অপরিহার্য।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর ‘DIY হোয়াইটেনিং’ টোটকা
বর্তমান সময়ে টিকটক বা ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ঘরোয়া উপায়ে দাঁত সাদা করার হাজার হাজার টিপস বা ভিডিও দেখা যায়। লেবুর রস, বেকিং সোডা, অ্যাপল সিডার ভিনেগার কিংবা চারকোল দিয়ে দাঁত মাজার এই জনপ্রিয় ট্রেন্ডটি আসলে হিতে বিপরীত হচ্ছে। লেবু বা ভিনেগারের তীব্র অম্ল এবং চারকোলের ঘর্ষণ সরাসরি দাঁতের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ বা এনামেলকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পদ্ধতিতে সাময়িকভাবে দাঁত সাদা দেখাতাও আসলে ক্ষতিকর স্তর অপসারণের ফল। যখন এনামেল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, তখন ভেতরের ‘ডেন্টিন’ স্তর বের হয়ে আসে এবং দাঁত ঘোলাটে ও স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ‘অ্যাগ্রেসিভ’ হোয়াইটেনিং পদ্ধতি থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৫. অসম্পূর্ণ ও দায়সারা পরিচ্ছন্নতা অভ্যাস
আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করেন কেবল সকালে দাঁত মাজাই যথেষ্ট। অথচ দন্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের বেলায় ব্রাশ করা সকালের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলা খাবার গ্রহণের ফলে যেসব সূক্ষ্ম অবশিষ্টাংশ দাঁতের কোণায় আটকে থাকে, রাতে ব্রাশ না করলে সেগুলো সারা রাত পচে তীব্র অ্যাসিড ও ক্যাভিটি সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বাজারে প্রচলিত কেবল স্বাদযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করাকে যথেষ্ট মনে করা হয়। চিকিৎসকরা বর্তমানে ‘এনামেল প্রোটেকশন ফরমুলা’ এবং ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহারের গুরুত্ব দিয়েছেন। ফ্লুরাইড দাঁতের দুর্বল স্তরগুলোকে পুনরায় শক্ত করতে সাহায্য করে। কেবল ৫ মিনিটের আলস্য থেকে দাঁত মাজার অনীহা দীর্ঘমেয়াদে জটিল রুট ক্যানাল সার্জারি বা দাঁত হারানোর মতো কারণ হতে পারে।
দন্ত ক্ষয় একমুখী পথ। একবার এনামেল হারিয়ে গেলে তা কৃত্রিম উপায় ছাড়া পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব। শক্তিশালী এবং টেকসই দাঁত বজায় রাখতে হলে দৈনন্দিন এসব ছোটখাটো ভুলের সংশোধন প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্তত প্রতি ছয় মাসে একবার চেকআপ এবং দিনে দুইবার দুই মিনিট করে সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করার অভ্যাস করলে বার্ধক্যেও নিজের প্রাকৃতিক দাঁত ব্যবহার করা সম্ভব। মনে রাখবেন, একটি সুন্দর হাসি শক্তিশালী দাঁতেরই প্রতিফলন।
