মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু মার্ক টালির প্রয়াণে তারেক রহমানের শোক

মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু মার্ক টালির প্রয়াণে তারেক রহমানের শোক: এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরবিদায়

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাবেক প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং বাংলার মানুষের দুঃসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সারথি স্যার মার্ক টালির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক আবেগঘন বার্তায় তিনি এই মহান সাংবাদিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

গতকাল রবিবার শেষ বিকেলে ভারতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্রিটিশ-ভারতীয় এই কিংবদন্তি সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বিগত এক সপ্তাহ ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও অসুস্থতা নিয়ে দিল্লির একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন।


বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রবিবার দিবাগত রাত তিনটায় তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করা বার্তায় লেখেন, “স্যার মার্ক টালির প্রয়াণের সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। মার্ক টালি ছিলেন একজন সম্মানিত সাংবাদিক এবং বাংলাদেশের একজন সত্যিকারের অকৃত্রিম বন্ধু।” তিনি উল্লেখ করেন যে, সাংবাদিকতার মাধ্যমে মার্ক টালি কেবল তথ্যই সরবরাহ করেননি, বরং তিনি সত্যের এমন এক আধার ছিলেন যা রণাঙ্গনে লড়াইরত মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল।

তারেক রহমান তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মার্ক টালির অবদানের কথা। তিনি বলেন, “বিবিসির হয়ে তাঁর ঐতিহাসিক রিপোর্টিং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের মরণপণ সংগ্রাম, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অদম্য আশা এবং ছাই থেকে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পগুলো বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দিয়েছিল।” তারেক রহমানের মতে, মার্ক টালির সাংবাদিকতা ছিল সততা, চরম মানবিকতা এবং চরমতম প্রতিকূলতার মাঝেও সত্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নিহিত। একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে প্রতিবার যখন এই দেশ সংকটে পড়েছে, তখনই মার্ক টালির সংহতি ও সাহসী কণ্ঠস্বর বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছে। আর এই অসামান্য ত্যাগের জন্য বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি তাঁর কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।


বাংলাদেশে যাঁরা একাত্তর দেখেছেন কিংবা ইতিহাস পড়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে মার্ক টালি নামটি ছিল শ্রদ্ধার আর ভরসার সমার্থক। যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার শাসনে পূর্ব বাংলার মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছিল এবং সরকারি গণমাধ্যম কেবল প্রোপাগান্ডা ছড়াত, তখন একমাত্র আশ্রয় ছিল বিবিসির শর্টওয়েভ রেডিওর সেই ঝাপসা আওয়াজ।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে মার্ক টালির দেওয়া একেকটি সংবাদ প্রতিবেদন তখনকার সাত কোটি বাঙালির মনে এক আকাশ আশা ও উদ্দীপনার জন্ম দিত। ‘দিস ইজ বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস… মার্ক টালি ফ্রম ঢাকা অর ক্যালকাটা’—এই কথাগুলো শোনার জন্য ঘরবন্দি মানুষ থেকে শুরু করে কাঁধে রাইফেল নিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারাও গভীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতেন। মার্ক টালি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধের বিভীষিকা আর পাকসেনাদের বর্বরতার বর্ণনা বিশ্ববাসীর কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে চূড়ান্ত ভূমিকা রেখেছিল।


স্যার মার্ক টালির সঙ্গে উপমহাদেশের সম্পর্ক ছিল আত্মিক। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত ভারতের ক্যালকাটায় (বর্তমানে কলকাতা)। শৈশবের একটি বড় সময় ভারতে অতিবাহিত হওয়ার কারণে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি খুব গভীরভাবে বুঝতে পারতেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত বই ‘নো ফুলস্টপস ইন ইন্ডিয়া’ উপমহদেশের রাজনীতি এবং যাপিত জীবনের এক প্রামাণ্য দালিল।

১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি জীবনের ৩০ বছরের বেশি সময় কাটান ভারতের ব্যুরো প্রধান হিসেবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আশির দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নানা চড়াই-উতরাইয়ের সরাসরি সাক্ষী ছিলেন তিনি। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনো আপস না করা এই মানুষটি বিবিসি থেকে অবসর গ্রহণের পরও ভারতকে নিজের বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ২০১২ সালে সাংবাদিকতা ও বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘ফেন্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার’ সম্মানে ভূষিত করে।


মার্ক টালির প্রয়াণে আন্তর্জাতিক সংবাদমহলে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। কেবল তারেক রহমানই নন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ ও মানবাধিকারকর্মীরা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন। সংবাদ জগতে তাঁকে ‘দ্য ভয়েস অফ সাউথ এশিয়া’ হিসেবে গণ্য করা হতো। তাঁর মৃত্যু সংবাদে গভীর শোক জানিয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বিবিসি।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে এবং দলের পক্ষ থেকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দও মার্ক টালির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তারেক রহমান তাঁর বিদেহী আত্মার পরম শান্তি কামনা করার পাশাপাশি তাঁর সহকর্মী এবং তাঁর প্রিয় বিবিসিতে কর্মরত সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তাঁর এই বিদায়কে বাংলাদেশের জন্য এক প্রবীণ পরম হিতৈষীকে হারানো হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক সচেতন মহল।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁকগুলোর ওপর চোখ বুলাবে, সেখানে স্যার মার্ক টালির কণ্ঠস্বর প্রতিটি শব্দের গভীরে প্রতিধ্বনিত হবে। আজকের বাংলাদেশের যে যাত্রা, সেই যাত্রার শুরুটা যাঁদের অবদানে বিশ্বময় অলংকৃত হয়েছিল, তাঁদের অগ্রগণ্য একজন হলেন এই চিরচেনা ব্রিটিশ সাংবাদিক—স্যার উইলিয়াম মার্ক টাল্লি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন