পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে যে ঘনীভূত কুয়াশা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার অবসান ঘটেছে। আদিয়ালা কারাগারে বন্দী এই নেতার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিতে গুরুতর সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তাঁর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। ইসলামাবাদের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন যে, চোখের রক্তনালিতে অতিরিক্ত চাপের কারণে পিটিআই প্রধানের দৃষ্টিশক্তি সাময়িকভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
গত শুক্রবার রাতে এক জরুরি ভিডিও বার্তায় ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-এর নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার খুঁটিনাটি বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁর এই বার্তার মাধ্যমে ইমরান খানের অনুসারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী উৎকণ্ঠা কিছুটা লাঘব হলেও, তাঁর সার্বিক নিরাপত্তা ও জেলখানার পরিবেশ নিয়ে পুনরায় আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে।
পিআইএমএস হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার জানিয়েছেন, একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ইমরান খানের ডান চোখ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায় যে, ইমরান খান ‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’ (Central Retinal Vein Occlusion) নামক এক জটিল চক্ষু সমস্যায় ভুগছিলেন। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে চোখের রেটিনায় রক্ত প্রবাহকারী প্রধান নালিটি কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত বা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে রেটিনায় রক্ত জমে যায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করেন কিংবা ঝাপসা দেখতে পান।
ডা. সিকান্দার বলেন, “ডান চোখের রক্তনালিতে অভ্যন্তরীণ চাপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় ইমরান খান অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি চোখে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদিয়ালা কারাগারের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক দল তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সুপারিশ করেন।”
হাসপাতাল সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত শনি ও রবিবারের মাঝামাঝি সময়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে গভীর রাতে ইমরান খানকে কারাগার থেকে পিআইএমএস হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সেখানে প্রথমে তাঁর চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ (Intraocular Pressure) পরিমাপ করা হয় এবং রেটিনার ত্রিমাত্রিক অবস্থা বুঝতে ‘ওসিটি’ (Optical Coherence Tomography) বা রেটিনা স্ক্যান করা হয়।
নির্বাহী পরিচালক জানান, অস্ত্রোপচারের সময় একটি জীবাণুমুক্ত থিয়েটারে বিশেষ চিকিৎসার প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা তাঁকে পূর্ণ বুঝিয়ে বলার পর এবং তাঁর লিখিত সম্মতির ভিত্তিতেই করা হয়েছিল। চিকিৎসার পর প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নিয়মাবলি দিয়ে পুনরায় তাঁকে আদিয়ালা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর এখন তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি বর্তমানে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
ইমরান খানের স্বাস্থ্যের খবর নিয়ে পাকিস্তানজুড়ে ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়লে গত শুক্রবার পিটিআই নেতাকর্মীরা রাজধানী ইসলামাবাদের রাজপথে নেমে আসেন। বিশেষ করে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে শত শত নেতাকর্মী ও দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল দুটি—প্রথমত, ইমরান খানের প্রকৃত স্বাস্থ্যগত অবস্থা বা মেডিক্যাল রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর পরিবার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের জরুরিভিত্তিতে আদিয়ালা কারাগারে তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া।
বিকেলের দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর পিটিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সালমান আকরাম রাজা আন্দোলনস্থলে এসে সমর্থকদের শান্ত করেন। তিনি বলেন, “আদালত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বাস দিয়েছে যে শীঘ্রই ইমরান খানের পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল রিপোর্ট আমাদের হস্তান্তর করা হবে।” যদিও সালমান আকরাম রাজা সতর্ক করে বলেন, কেবল মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়াই তাঁদের একমাত্র বিজয় নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবন নিয়ে সরকারের উদাসীনতা এবং পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতে ক্রমাগত বাধা দান করার যে নীতি সরকার নিয়েছে, তার অবসান না হওয়া পর্যন্ত পিটিআই মাঠের তৎপরতা থেকে সরবে না।
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে শুরুতে সরকারি পক্ষ এবং ইমরান খানের পরিবার থেকে সাংঘর্ষিক তথ্য পাওয়ায় দেশজুড়ে গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলেছিল। গত বুধবার যখন হাসপাতালে নেওয়ার খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে, তখন ইমরান খানের বোন নওরিন খান তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন তাঁর ভাই সুস্থ আছেন।
তবে বিতর্কের মুখে গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আনুষ্ঠানিক প্রেস কনফারেন্সে স্বীকার করেন যে, কারা চিকিৎসকদের পরামর্শে এবং পিটিআইয়ের ক্রমাগত দাবির মুখে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার প্রথমে বিষয়টি চেপে যেতে চেয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় তারা তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।
ইমরান খানের দীর্ঘ কারাবাস এবং বারবার তাঁর শারীরিক অসুস্থতার খবর বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর আগেও তিনি আদালত চত্বরে আহত হয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের সাথে আদিয়ালা কারাগারে থাকা এই জনপ্রিয় নেতার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পাকিস্তানজুড়ে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা ধরা পড়ার পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলছে যে, কারাগারে কি সঠিক সুষম খাদ্য ও ব্যায়ামের সুযোগ পাচ্ছেন ইমরান খান? নাকি অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিবেশই তাঁর এই রোগের অন্যতম কারণ।
এদিকে পিটিআই নেতারা জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রতিশ্রুত মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে কোনো অবহেলা হয়েছে, তবে তারা দেশের উচ্চ আদালতে নতুন করে রিট পিটিশন দাখিল করবেন। বর্তমানে সারা পাকিস্তানের মানুষের দৃষ্টি এখন আদিয়ালা জেলের দেয়ালের দিকে—কেমন আছেন তাদের জনপ্রিয় নেতা, আর কত দ্রুত পুনরুদ্ধার হবে তাঁর চোখের হারানো আলো।
বাংলা রয়টার্স সার্বক্ষণিক নজর রাখছে পাকিস্তানের এই সংবেদনশীল রাজনৈতিক এবং মানবিক পরিস্থিতির ওপর।
