রেকর্ড উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়ল সোনার দাম

রেকর্ড উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়ল সোনার দাম: বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশে ভরিতে কমল ১৫ হাজার টাকার বেশি

সারা বিশ্বজুড়ে টালমাটাল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সোনার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মূল্যবান এই ধাতুর দাম আকাশছোঁয়া অবস্থান থেকে দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে শুক্রবার প্রতি আউন্স সোনার দাম রেকর্ড ৪৩৪ ডলার ৪৫ সেন্ট কমে যাওয়ায় দেশের বাজারেও তার ব্যাপক প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে। ইতিহাসে প্রথমবার আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করার মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই সোনার দাম এখন ৫ হাজার ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই দেশের বাজারে আজ শনিবার সকালে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) সোনার দাম ব্যাপক হারে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এতে করে ক্রেতাসাধারণের মধ্যে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরলেও অস্থির বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কাবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।


আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছিল। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের আবহে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে একপর্যায়ে দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু শুক্রবার দিনের লেনদেনের শেষ নাগাদ তা ৪ হাজার ৮৯৩ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৬০০ ডলারের বেশি কমেছে। কেবল গত এক দিনেই দাম কমার পরিমাণ আউন্সপ্রতি প্রায় ৪৩৪ ডলার।

মূল্যবান ধাতুটির এই হঠাৎ দরপতনের মূল কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিমালার স্থিতিশীলতাকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বা ‘ফেড’-এর পরবর্তী চেয়ারম্যান পদের মনোনয়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে ভীতি কাজ করছিল, তা দূর হওয়ায় সোনার বাজার থিতু হয়েছে।


প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেন, তা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজার ও সোনার বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প হয়তো এমন একজনকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাবেন, যিনি হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক চাপে পড়ে ঋণের ওপর সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত কমিয়ে দেবেন। এতে করে মার্কিন ডলারের মান মারাত্মকভাবে পড়ে যাওয়া এবং বড় আকারের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতো। মূলত সেই মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি থেকে মূলধনের সুরক্ষা পেতে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীরা দলবদ্ধভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

তবে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায় যখন জানা যায় যে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত ‘কেভিন ওয়ারশ’-কে পরবর্তী ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দিতে চলেছেন। আর্থিক মহলে কেভিন ওয়ারশ অত্যন্ত রক্ষণশীল ও স্থিতিশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় তাকে তুলনামূলকভাবে ‘নিরাপদ’ মনে করছেন গোল্ডেন স্ট্রিটের বিশ্লেষকরা। এই একটি খবরের ফলেই সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের বাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ তুলে ডলারে ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন। ফলে দ্রুত পতনের মুখে পড়ে এই মূল্যবান ধাতুগুলো।


বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে দেশের বাজারের ক্রেতাদের অনুকূলে আনতে আজ শনিবার সকালেই বৈঠক শেষে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) স্থানীয় বাজারে বড় অংকের দর হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের ইতিহাসে এর আগে একক ঘোষণায় এত বেশি পরিমাণ দাম কমানোর নজির বেশ বিরল। বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট সোনার দাম ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দাম যেভাবে প্রতি ভরি ৩ লাখ টাকার দিকে এগোচ্ছিল, এই পতন সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তি বয়ে এনেছে।

নতুন তালিকা অনুযায়ী:

  • ২২ ক্যারেট (ভালো মানের): ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা (ভরি প্রতি কমল ১৫,৭৪৬ টাকা)।
  • ২১ ক্যারেট: ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা (ভরি প্রতি কমল ১৪,৯৮৮ টাকা)।
  • ১৮ ক্যারেট: ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা (ভরি প্রতি কমল ১২,৮৮৮ টাকা)।
  • সনাতন পদ্ধতির সোনা: ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকা (ভরি প্রতি কমল ১০,৯৬৪ টাকা)।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই মূল্য সংশোধনের ফলে আসন্ন বিয়ের মৌসুমে বাজারে পুনরায় লেনদেনের জোয়ার আসবে। তবে যারা চড়া দামে কেনা সোনা নিয়ে মজুদ রেখেছিলেন, তারা বর্তমান বাস্তবতায় সাময়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।


দামের হঠাৎ পতন ঘটলেও সোনাকে এখনো বাজারের ‘কিংবদন্তি নিরাপদ বিনিয়োগ’ হিসেবে অভিহিত করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। এবিসি রিফাইনারির বৈশ্বিক প্রধান নিকোলাস ফ্রাপেল মনে করেন, সোনার দর কমেছে মার্কিন নীতির প্রভাবে কিন্তু সামগ্রিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এখনো সোনার অনুকূলে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সামরিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত শুল্ক যুদ্ধের হুমকি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি সোনার বাজারকে যেকোনো সময় আবারও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। ফ্রাপেল বলেন, “সোনা হলো এমন এক বিনিয়োগ যা শেয়ারের মতো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর বা ঋণের হারের ওপর সরাসরি দীর্ঘ মেয়াদে দায়বদ্ধ নয়। এটি একটি স্বাধীন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগ সম্পদ।”

অন্যদিকে সোনার উত্তোলন ক্ষমতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি)। তাদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টন সোনা ভূগর্ভ থেকে তোলা হয়েছে। এটি পরিমাণে এতটাই কম যে, ৩-৪টি অলিম্পিক সুইমিংপুল পূর্ণ করলেই তা ফুরিয়ে যাবে। বর্তমান তথ্যমতে, মাটির নিচে আর মাত্র ৬৪ হাজার টন সোনার মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মানে হলো—ভবিষ্যতে সোনার জোগান চাহিদার তুলনায় মারাত্মক কম হতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সোনার দাম বাড়িয়েই রাখবে।

সব মিলিয়ে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কেবল স্বল্প মেয়াদে দাম বাড়া বা কমার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়ের জন্য এই সময়কে ‘ক্রয়ের সঠিক সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সোনার হঠাৎ বড় পতনের ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান আবার দ্রুত পূর্ণ হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে বিশ্ব বাজার থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন