আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসি ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের আগে এক বিশাল ট্র্যাজেডির নাম ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবল দল। তখন ফুটবল বিশ্বে একটি আক্ষেপ মিশ্রিত প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হতো—‘মেসি একা কী করবেন?’ রিয়াল মাদ্রিদ ভক্তদের জন্য এখন সেই চিরচেনা বেদনাদায়ক সুরটি আবারও ফিরে এসেছে। কেবল প্রেক্ষাপট বদলেছে, সাদা জার্সিতে মেসির সেই একাকী যুদ্ধের জায়গা দখল করেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। আধুনিক ফুটবল বিশ্ব এখন অবাক বিস্ময়ে রিয়াল মাদ্রিদকে দেখে প্রশ্ন ছুড়ছে—‘রিয়ালকে জেতাতে এমবাপ্পে একা আর কত দূর লড়বেন?’
রিয়াল মাদ্রিদ বরাবরই ‘গ্যালাকটিকোস’ নীতিতে বিশ্বাসী। তারকায় ঠাসা এই দলটিতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম কিংবা রদ্রিগোদের মতো বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সেনানিরা থাকা সত্ত্বেও লস ব্লাঙ্কোসরা কেন আজ কেবল একক শক্তিনির্ভর একটি দলে পরিণত হয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রিয়ালের সমস্ত আশার বাতিঘর এখন শুধু কিলিয়ান এমবাপ্পে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের পরশু রাতের সেই ম্যাচটি রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ৪–২ গোলে বেনফিকার কাছে হার মেনে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসরে ছিটকে পড়তে হয়েছে লস ব্লাঙ্কোসদের। কিন্তু হারের ধুলিকণার মধ্যে একটি হিরন্ময় নাম ছিল উজ্জ্বল—কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৪–২ গোলের হারের পরও পরিসংখ্যান এমবাপ্পের চেষ্টাকে এক অনন্য উচ্চতায় রেখেছে। ম্যাচের খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ শট (৪টি) এবং সফল ড্রিবলিং (৪টি) ছিল তাঁর নামের পাশে। আক্রমণভাগের সামনের অংশে বা ‘অ্যাটাকিং থার্ডে’ দলের হয়ে সর্বোচ্চ ২২টি সফল পাস দিয়েছেন তিনি। কেবল আরদা গুলের ছাড়া দলের আর কোনো ফুটবলার তাঁর মতো গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। এমনকি ওই ম্যাচে দলের যে সামান্য প্রাপ্তি, সেই দুটি গোলও এসেছে এমবাপ্পের জাদুকরী পা থেকে। এই তথ্যগুলোই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বাকি সতীর্থরা যখন মুখ থুবড়ে পড়েছিল, এমবাপ্পে তখনও তাঁর সর্বস্ব দিয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন।
২০২৫–২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ এখন পর্যন্ত ৩৩টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেছে। এই ম্যাচগুলোতে দলের মোট গোলসংখ্যা ৭৫। কিন্তু অবাক করার মতো তথ্য হলো, এর মধ্যে একাই ৩৬টি গোল করেছেন এমবাপ্পে। শতাংশের হিসেবে দলের মোট গোলের প্রায় অর্ধেক বা ৪৮ শতাংশই তাঁর দান। অথচ রিয়ালের অন্য কোনো ফুটবলার এখনো গোলের দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারেননি। যে ভিনিসিয়ুসকে ব্যালন ডি’অর বা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তাঁর ঝুলিতে রয়েছে মাত্র ৭ গোল। বেলিংহামের অবদান ৬ গোল। লা লিগায় ২০ ম্যাচে ২১ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে রয়েছেন এই ফরাসি। বিপরীতে ভিনিসিয়ুস মাত্র ৫ গোল নিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে সব দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ২৩তম অবস্থানে। এই যোজন যোজন পার্থক্যটিই প্রমাণ করে রিয়াল মাদ্রিদ বর্তমানে এমবাপ্পের ওপর কতটা ‘ক্রীতদাসের মতো’ নির্ভর করছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চেও এমবাপ্পের শাসন চলছে। ৭ ম্যাচে ১৩ গোল নিয়ে তিনি তালিকার শীর্ষে। কিন্তু রিয়ালের বাকি খেলোয়াড়দের এই গোল করার প্রতিযোগিতায় খুঁজতে হলে টেলিস্কোপের সাহায্য প্রয়োজন। কারণ গোলদাতার শীর্ষ ৫০-এর তালিকায়ও বেলিংহাম বা ভিনিসিয়ুসদের নাম খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। ৭ ম্যাচে মাত্র ২ গোল করা বেলিংহাম রয়েছেন ৫৪তম অবস্থানে। এর প্রভাব পড়েছে দলগত ফলাফলেও। রিয়াল চ্যাম্পিয়নস লিগের সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা পেতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের প্লে–অফের অগ্নিপরীক্ষা পার হতে হবে।
বার্সেলোনা একটা লম্বা সময় যেমন কেবল লিওনেল মেসির জাদুতে জিতেছে এবং মেসির ব্যর্থতার দিনে ছারখার হয়েছে, রিয়াল মাদ্রিদও এখন একই ‘অসম ভারসাম্যের’ জালে আটকা পড়েছে। যখন একজন খেলোয়াড় দলের প্রায় অর্ধেক গোল করেন, তখন সেই দলের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ধরা দেয়। স্প্যানিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এএস’ জানিয়েছে, গত দুই মাসের পরিসংখ্যানে রিয়ালের ৬২.১ শতাংশ গোলই একার কাঁধে বয়েছেন এমবাপ্পে। সর্বশেষ ১২টি ম্যাচে তিনি ১৮টি গোল করেছেন। তবে ট্র্যাজেডি হলো, সেল্টা ভিগো ও বার্সেলোনার বিপক্ষে যে দুটি ম্যাচে তিনি গোল পাননি, সেই দুটিতেই বড় ব্যবধানে হেরেছে রিয়াল মাদ্রিদ। অর্থাৎ মাদ্রিদকে হারানোর ফর্মুলা এখন ওপেন সিক্রেট—কেবল এমবাপ্পেকে থামিয়ে দিতে পারলেই মাদ্রিদ ধসে পড়বে।
এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে আসার পর অনেকেই সান্তিয়াগো বার্নাব্যু-তে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছায়া দেখছেন। ২০১৩ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে রোনালদো সর্বোচ্চ ৫৯টি গোল করেছিলেন, এমবাপ্পে ইতিমধ্যেই সেই রেকর্ড ছুঁয়েছেন। ২০১৪-১৫ মৌসুমে সিআরসেভেন ৬১টি গোল করেছিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের ব্যক্তিগত সেরা রেকর্ড। বর্তমান গতিপথ অব্যাহত থাকলে (প্রতি ম্যাচে ১.২৪টি গোল) মরসুম শেষে এমবাপ্পের ঝুলিতে ৬৬টি গোল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় পার্থক্য হলো, রোনালদোর সেই রাজত্বের দিনে তিনি কখনোই রিয়ালের মোট গোল সংখ্যার ৩৭.৬ শতাংশের বেশি একাই বহন করেননি। বাকি গোল আসত বেনজেমা, বেল বা অন্য তারকার পা থেকে। কিন্তু এমবাপ্পের বর্তমান অবদান ৬২ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে, যা দলের অন্য বিভাগগুলোর জন্য একটি বিশাল লাল সংকেত বা অ্যালার্মিং বেল।
ফুটবল শেষ পর্যন্ত এগারো জনের লড়াই, এটি কোনো একক মহড়া নয়। বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায় কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন আধুনিক ফুটবলের এক নিরুপায় ট্রয়বীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর প্রতিভা ও প্রচেষ্টা দলের দুর্বলতার গর্তগুলোকে ভরাট করতে চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদে একা একটি ট্রফি জয়ের নেশায় মাতোয়ারা বড় দলকে টানা অসম্ভব। ভক্তদের প্রশ্ন এখন তাই ফুটবল ছাপিয়ে আবেগের জায়গায় মিশে গেছে—যদি এমবাপ্পে ছন্দে না থাকেন বা চোটাক্রান্ত হন, তবে এই রিয়াল মাদ্রিদকে মরুভূমি হওয়া থেকে বাঁচাবে কে?
