ভারতীয় উপমহাদেশের সমকালীন সংগীতাঙ্গনের অবিসংবাদিত সম্রাট, যার কন্ঠের মায়াজালে আবদ্ধ কোটি কোটি হৃদস্পন্দন— সেই অরিজিৎ সিং এবার প্লেব্যাক সংগীত থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে এক অভাবনীয় আলোড়নের সৃষ্টি করেছেন। প্রজাতন্ত্র দিবসের সন্ধ্যায় নতুন একটি ছবির গান মুক্তির রেশ কাটতে না কাটতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট বার্তা সংগীতাঙ্গন এবং চলচ্চিত্র মহলে এক গভীর ‘ধোঁয়াশা’ এবং উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ভক্তরা যখন তাঁর পরবর্তী সুরের জাদুর জন্য অধীর অপেক্ষায়, তখনই গায়ক সাফ জানিয়ে দিলেন— তিনি আর কোনো ‘নতুন’ প্লেব্যাক সংগীতের দায়িত্ব নেবেন না।
ফেসবুক পোস্টে বিস্ফোরক ঘোষণা
গত মঙ্গলবার অরিজিৎ সিংয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং নতুন বছরে ভক্তদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি লেখেন:
“হ্যালো, সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এত বছর ধরে একজন শ্রোতা হিসেবে আপনারা আমাকে যা দিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আজ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে একটি সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছি— প্লেব্যাক ভোকালিস্ট হিসেবে আমি আর নতুন কোনো কাজ নেব না। এখানেই আমি এই পথচলাটি সমাপ্ত করছি। পুরো যাত্রাটি ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।”
এই বার্তার পরপরই ইন্টারনেটে গুঞ্জন শুরু হয়— তবে কি অরিজিৎ সংগীত জগত থেকেই চিরবিদায় নিচ্ছেন? গায়কের প্রতি অসীম ভালোবাসার টানে অনেক ভক্তই কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় পোস্টটি, যা কয়েক লাখ মন্তব্য আর প্রতিক্রিয়ায় সয়লাব হয়ে ওঠে।
সংগীত থামছে না, কেবল প্রেক্ষাপট বদলাচ্ছে
অরিজিৎ সিং যে সাধারণ কোনো শিল্পী নন, তার প্রমাণ মিলল তাঁর পরবর্তী ব্যাখ্যামূলক পোস্টে। তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন যে তাঁর আগের পোস্টটি অনেকের মধ্যেই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি পুনরায় স্পষ্ট করে জানান যে তিনি ‘গান গাওয়া’ ছাড়ছেন না, বরং শুধু চলচ্চিত্রের পর্দার পেছনের গায়ক বা ‘প্লেব্যাক সিংগিং’ এর নির্দিষ্ট বৃত্ত থেকে নিজেকে বের করে আনছেন।
তিনি লেখেন, “আমি পরিষ্কার করে বলছি— আমি সংগীতের কাজ বন্ধ করছি না। আমি সুসংগীতের একজন অনুরাগী। আগামী দিনগুলোতে আমি একজন সাধারণ শিল্পী হিসেবেই আরও বেশি করে শিখব এবং সংগীত সাধনা চালিয়ে যাব। সংগীত তো কেবল চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”
অনুরাগীদের কৌতুহলের জবাব দিতে গিয়ে জনপ্রিয় মাইক্রো-ব্লগিং সাইট ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) অরিজিৎ জানান যে, এখনই গান মুক্তি পাওয়া বন্ধ হচ্ছে না। কারণ, তিনি ইতোমধ্যেই যে সকল চুক্তিবদ্ধ কাজ বা প্লেব্যাক সংগীতের দায়িত্ব নিয়ে রেখেছেন, সেগুলো তিনি সুচারুভাবে সম্পন্ন করবেন। অরিজিতের ভাষায়, “কিছু কাজ এখনো নির্মাণাধীন আছে। চলতি বছরেও আপনারা অনেক নতুন রিলিজ পাবেন। শুধু নতুন আর কোনো চলচ্চিত্রের প্রস্তাব গ্রহণ করছি না।”
বিরাট কোহলির টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায়ের সঙ্গে তুলনা
অরিজিতের এই ঘোষণায় ভারতের সাধারণ শ্রোতামহল কতটা সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে, তার ছাপ মিলেছে জনৈক এক ভক্তের মন্তব্যে। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, “বিরাট কোহলি যেদিন টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন, ঠিক ততটাই মন খারাপ আর শূন্যতা অনুভব করছি আজকের দিনটিতে।”
অনেকে মনে করছেন, এটি কেবল কোনো একক গায়কের বিদায় নয়, বরং একটি সুবর্ণ যুগের পরিসমাপ্তি। প্রেমের গান (অরিজিতের ঘরানা), বিচ্ছেদ, আনন্দ কিংবা এমনকি রাজনৈতিক বা ভক্তিগীতির যে অসাধারণ ভার্সেটালিটি অরিজিৎ গড়ে তুলেছিলেন, তাতে ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে ‘হিট’ মানেই ছিল অরিজিতের কণ্ঠ। তাই ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ প্লেব্যাক ব্যবসা কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে প্রযোজক মহলেও এক ধরণের স্নায়ুচাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জিয়াগঞ্জের গলি থেকে রাজপথ: ফিরে দেখা অরিজিৎ
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের এক ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় হওয়া সেই তরুণটি কীভাবে বিশ্বসেরা পারফর্মার হয়ে উঠলেন, তা আজও অনেক উদীয়মান সংগীতশিল্পীর অনুপ্রেরণা। ২০০৫ সালে ভারতের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সে সময় প্রথম সারির তো দূরে থাক, সেরা পাঁচেও জায়গা হয়নি তাঁর। ষষ্ঠ হয়ে ঝরে পড়া সেই কিশোরটি দমে যাননি।
এরপর মুম্বাইয়ের রাজপথে লম্বা সংগ্রামের দিন। ২০০৭ সালে কিংবদন্তি নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালির ছবিতে রেকর্ড করা গানও পরে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে ‘মার্ডার ২’ চলচ্চিত্রের ‘ফির মহব্বত’ গানে যখন তাঁর প্রথম সুযোগ এল, দর্শক নতুন এক মায়াবী গায়ককে আবিষ্কার করলেন। আর ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ ছবির সেই বিশ্বনন্দিত গান ‘তুম হি হো’ মুক্তির পর পুরো ভারতীয় সংগীত মানচিত্রই যেন বদলে গেল। মুর্শিদাবাদ থেকে তারকাখ্যাতির এই শিখরে ওঠার মাঝখানে অরিজিৎ সিং কেবল সুর বিলিয়ে যাননি, বরং নিজের শেকড় এবং চারিত্রিক নম্রতা দিয়ে জিতেছেন কোটি মানুষের মন।
ভবিষ্যৎ কী: প্লেব্যাকের গ্ল্যামার নাকি স্বাধীন সংগীত সাধনা?
কেন অরিজিৎ এই হঠকারী কিন্তু বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে এখন বড় ধরণের আলোচনা চলছে শিল্প মহলে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অরিজিৎ বর্তমানে ক্যারিয়ারের এমন এক চূড়ায় পৌঁছেছেন যেখানে বড় বাজেটের কমার্শিয়াল বা তথাকথিত আইটেম নাম্বার করার চেয়ে ‘পিওর আর্ট’ বা শুদ্ধ সংগীতচর্চায় নিজের সময় ব্যয় করতে চান। সম্ভবত স্বাধীন সংগীত (Indie Music) কিংবা ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানাকে বিশ্বের সামনে ভিন্নভাবে তুলে ধরাই হতে পারে তাঁর নতুন লক্ষ্য।
অনেকের মতে, তিনি হয়তো ভবিষ্যতে একক সংগীত বা নন-ফিল্ম অ্যালবাম নিয়ে আরও কাজ করতে চান। তাঁর ঘোষণা থেকে স্পষ্ট, গায়ক হিসেবে তিনি থেমে নেই, তিনি থামতে চাইছেন একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। তিনি আর হয়তো কোনো চরিত্রের পেছনে গায়ক হিসেবে আবদ্ধ থাকতে চাইছেন না।
আপাতত অরিজিতের কথায় একটা চরম সত্য আমাদের সামনে উঠে আসছে— গান কখনো থামে না, বদলায় কেবল পথ আর গন্তব্য। পর্দা নয়, অরিজিৎ এবার বোধহয় আমাদের প্রতিটি দিনলিপির সুরে সুর মেলাবেন স্বাধীনভাবে। অরিজিতের ভক্তরা দীর্ঘনিঃশ্বাস চেপে নতুন সেই স্বাধীন সংগীত সফরের প্রহর গুণতে শুরু করেছেন।
