রেকর্ডবই ওলটপালট: তিরুবনন্তপুরমে ছক্কা-বৃষ্টি ও ইশান-সূর্য ঝড়ে বিধ্বস্ত নিউজিল্যান্ড

রেকর্ডবই ওলটপালট: তিরুবনন্তপুরমে ছক্কা-বৃষ্টি ও ইশান-সূর্য ঝড়ে বিধ্বস্ত নিউজিল্যান্ড

ভারতের কেরালা রাজ্যের রাজধানী তিরুবনন্তপুরমের গ্রিনফিল্ড স্টেডিয়াম গত কাল রাতে প্রত্যক্ষ করল আধুনিক টি-২০ ক্রিকেটের এক অভাবনীয় তান্ডব। ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার পঞ্চম ও শেষ টি-২০ ম্যাচটি কেবল একটি খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল বিশ্বরেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক মহাকাব্যে। পুরো ম্যাচে দুই দল মিলে তুলল প্রায় ৫০০ রান (৪৯৬)। যেখানে ব্যাটসম্যানদের দাপটে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে বোলারদের। ৪৬ রানের এই জয়ে ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ নিশ্চিত করেছে স্বাগতিক ভারত। পরিসংখ্যানের পাতায় গত কাল রাতের প্রতিটি পরত ছিল বিস্ময়কর।

বিধ্বংসী ২৭১ এবং আড়াই শ রানের সিংহাসন
ভারতের তোলা ২৭১ রান আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ সংগ্রহ। কিউই বোলারদের পিষে ফেলে সূর্য-ইশানরা এই রানের পাহাড় গড়েন। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এটি যেকোনো দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান। এই ম্যাচ নিয়ে ভারত চতুর্থবারের মতো টি-২০ ফরম্যাটে ২৫০ বা তার বেশি রানের ঘর স্পর্শ করল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি একটি রেকর্ড, যা ভারত জিম্বাবুয়েকে পেছনে ফেলে এককভাবে দখল করল। ঘরোয়া এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ মিলিয়ে ভারতের উপরে এখন কেবল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ (পাঁচটি ২৫০+ ইনিংস)।

এক ম্যাচে ছক্কার তুফান: ৩৬ বার আকাশযাত্রা
তিরুবনন্তপুরমে গ্যালারির দর্শকদের কাজ ছিল কেবল আকাশপানে চেয়ে থাকা। পুরো ম্যাচে ছক্কা হয়েছে মোট ৩৬টি, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে ছক্কার দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ভারত একাই মেরেছে ২৩টি ছক্কা, যা ভারতের নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ডকে স্পর্শ করেছে। পুরো পাঁচ ম্যাচের দ্বিপক্ষীয় এই সিরিজে মোট ১১৬টি ছক্কা হয়েছে, যার মধ্যে ভারত একাই ৬৯টি ছয় হাঁকিয়ে এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজ বা টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ছক্কার এই আধিক্য কেবল আধুনিক ব্যাটিং পাওয়ার-হিটিংয়ের বিবর্তনকেই ফুটিয়ে তোলে।

ইশানের বজ্র হুঙ্কার ও সূর্যের রেকর্ড-ভাঙ্গা ৩০০৩
উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ইশান কিষাণ ছিলেন গতকালকের রিং-মাস্টার। কিউই পেসারদের ক্লাবের ক্রিকেটের স্তরে নামিয়ে তিনি মাত্র ৪২ বলে তাঁর সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এর চেয়ে দ্রুত কোনো সেঞ্চুরি আন্তর্জাতিক টি-২০ এর আগে দেখেনি। এটি ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে পঞ্চম দ্রুততম শতরান। ইশানের এই দাপুটে ইনিংসে ভারত ক্রিকেটের এই ক্ষুদ্র সংস্করণে মোট ২৫টি ব্যক্তিগত সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করল। তালিকায় ১৩টি সেঞ্চুরি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় স্থানে আছে, যা ভারতের শ্রেষ্ঠত্বকেই প্রমাণ করে।

পাশাপাশি, ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এক অন্য উচ্চতায় আরোহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক টি-২০ ফরম্যাটে দ্রুততম ৩০০০ রান পূর্ণ করার বিশ্বরেকর্ড এখন তাঁর দখলে। মাত্র ১৮২২ বল খেলে তিনি এই কীর্তি গড়লেন, যেখানে আরব আমিরাতের মোহাম্মদ ওয়াসিম সমপরিমাণ রান করতে নিয়েছিলেন ১৯৫৭ বল। অর্থাৎ বলের হিসাব অনুযায়ী সূর্যই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে মারকাটারি ৩০০০ সংগ্রাহক।

কিউইদের প্রতি আক্রমণ: লিটনকে পেছনে ফেললেন অ্যালেন
রানের পাহাড় তাড়া করতে নেমে ফিন অ্যালেন যা করলেন, তাকে সাহসী প্রতিরোধ না বলে ‘সুইসাইড মিশন’ বলা ভালো। পাওয়ার-প্লে’তে তিনি যে তান্ডব চালিয়েছেন, তাতে ভারত শিবিরেও এক সময় স্তব্ধতা নেমে আসে। ম্যাচের প্রথম ৬ ওভারে অ্যালেন করেন ৫৭ রান। ২০২২ বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে লিটন দাসের ৫৬ রানের সেই ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে দিলেন কিউই হার্ডহিটার। ভারতের বিরুদ্ধে পাওয়ার-প্লেতে এটাই এখন ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান। তাঁর কল্যানে নিউজিল্যান্ড মাত্র ৩.১ ওভারেই ৫০ রান পূর্ণ করে, যা ভারতের বিপক্ষে যেকোনো দেশের দ্রুততম। প্রথম ৬ ওভারে দলগত সংগ্রহ ৭৯ রান ভারতের বিরুদ্ধে বিপক্ষ দলের নতুন নজির তৈরি করেছে।

বোলারদের রাত-দুঃস্বপ্ন ও অর্শদীপ-বুমরার বৈপরীত্য
ব্যাটসম্যানদের এই দিগি্বজয়ী দিনে বোলারদের জন্য কপালে ছিল কেবল গঞ্জনাই। গত কাল রাতে ৫ জন বোলার খরচ করেছেন ৫০-এর বেশি রান, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরল এবং এর আগে মাত্র একবার ২০২৪ সালে জিম্বাবুয়ের ম্যাচে ঘটেছিল।

ভারতের স্ট্রাইক বোলার যশপ্রীত বুমরা কাল কেরিয়ারের অন্যতম দুঃসহ দিনের মোকাবিলা করেছেন। ৪ ওভারে ৫৮ রান খরচ করেছেন এই ‘ইয়োর্কার স্পেশালিস্ট’, যা তাঁর টি-২০ কেরিয়ারে সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল পরিসংখ্যান। বিশেষ করে একটি ওভারেই ২২ রান দিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, যা তাঁর সুনামকে কিছুটা ম্লান করে দেয়।

অদ্ভূত এক অভিজ্ঞতা হয়েছে অর্শদীপ সিংয়ের। এক ম্যাচে ৪ ওভার বল করে ৫১ রান দিলেও তিনি ৫ উইকেট শিকার করেন। আন্তর্জাতিক টি-২০ ইতিহাসে সবচেয়ে ‘খরচপাতি’ করা ৫ উইকেট এখন তাঁরই নামে পাশে শোভা পাচ্ছে। অর্থাৎ তিনি প্রতি উইকেটের জন্য যেমন হাত খুলে রান দিয়েছেন, তেমনি তুলে নিয়েছেন কিউই মিডল-অর্ডার।

সিরিজ শেষে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের এই টি-২০ দ্বৈরথ বুঝিয়ে দিল কেবল ডিফেন্স করে আর এখন সাদা বলের ক্রিকেটে টেকা সম্ভব নয়। প্রতিটি রেকর্ড বইকে নতুন করে ছাপার নির্দেশ যেন সূর্যকুমার আর ইশান কিষাণ দিয়ে দিলেন কেরালাতে বসে। ভারত কেবল ৪-১ এ সিরিজ জেতেনি, তাঁরা ক্রিকেট বিশ্বের বাকি দেশগুলোর জন্য পাঠিয়ে দিল কড়া বার্তা—টি-২০ এর রান-আক্রমণের মূল কারিগর এখন ‘টিম ইন্ডিয়া’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন