অবশেষে মার্কিন পুজিঁবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) পাঠানো আইনি সমন বা নোটিশ গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছেন ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানি এবং তাঁর ভাইপো সাগর আদানি। এর মধ্য দিয়ে আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা কয়েক শত কোটি ডলারের ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে চলা প্রায় ১৪ মাসের এক জটিল কূটনৈতিক ও আইনি অচলাবস্থার অবসান ঘটল। নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত গত শুক্রবার আদানিদের মার্কিন আইনজীবীদের সঙ্গে এসইসি-র করা এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে।
এর আগে ভারত সরকারের ক্রমাগত আপত্তি এবং প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মার্কিন আদালতের এই অতিপ্রয়োজনীয় নথিপত্র বিবাদীদের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমন গ্রহণের এই আনুষ্ঠানিক সম্মতির ফলে বিষয়টি এখন চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের পথে এক ধাপ অগ্রসর হলো।
আদালতের নথি ও আইনজীবীদের ভূমিকা
নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের ডিস্ট্রিক্ট আদালতে গত শুক্রবার দাখিল করা নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিবাদীপক্ষের মার্কিন আইনজীবীরা ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সমন গ্রহণে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। এর ফলে বিচারিক নথিপত্র হস্তান্তরের জন্য আদালতের পক্ষ থেকে কোনো আলাদা বিশেষ আদেশের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ নিকোলাস জি গারাউফিস উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে প্রস্তুতকৃত এই সমঝোতা প্রস্তাব বা ‘স্টিপুলেশন’ গ্রহণ করেছেন।
বিবাদীপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি নামকরা আইনি প্রতিষ্ঠান— সুলিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েল, নিক্সন পিবডি এবং হেকার ফিঙ্ক লড়ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আদানিদের প্রধান আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রা জুনিয়র বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ব্যক্তিগত আইনি লড়াইয়েও যুক্ত আছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন রাজনৈতিক ও আইনি মহলে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই আইনজীবীদের সম্মতিতেই আদানিরা নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।
৯০ দিনের সময়সীমা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ
মার্কিন ফেডারেল আদালতের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, সমন জারির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গৌতম ও সাগর আদানি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ৯০ দিন সময় পাবেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, ফেডারেল রুল অব সিভিল প্রসিডিউর অনুযায়ী দায়ের করা জালিয়াতির অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়া; অথবা মামলাটি খারিজ করার জন্য আদালতের কাছে শক্তিশালী যুক্তিসহ আবেদন করা।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমন গ্রহণে সম্মত হলেও আদানিরা ‘পার্সোনাল জুরিসডিকশন’ বা ব্যক্তিগত এখতিয়ারসংক্রান্ত অধিকারটি সংরক্ষণ করছেন। অর্থাৎ তাঁরা ভবিষ্যতে আদালতে এই দাবি তুলতে পারবেন যে মার্কিন আইন বা আদালতের ভারতের নাগরিকদের ওপর কোনো বিচারিক কর্তৃত্ব নেই।
ভারত সরকারের বাধা ও এসইসির দীর্ঘ প্রচেষ্টা
সমন জারির এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হেগ কনভেনশন অনুসরণ করে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নথি পাঠানোর চেষ্টা করেছিল এসইসি। কিন্তু ভারত সরকার বারবার নানা যান্ত্রিক ও প্রবিধানগত ত্রুটির দোহাই দিয়ে এই অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত দাবি করেছিল যে এসইসি-র নথিতে প্রয়োজনীয় সীল এবং স্বাক্ষর নেই। পরবর্তীতে মে মাসে সেই ঘাটতি পূরণ করা হলেও কয়েক মাস কোনো উত্তর মেলেনি। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অদ্ভুত এক আইনি যুক্তিতে দাবি করে যে এসইসির এই মামলায় হেগ কনভেনশন ব্যবহারের এখতিয়ারই নেই।
এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে গত ২১ জানুয়ারি এসইসি সরাসরি আদালতে আবেদন করে যাতে ই-মেইল বা মার্কিন আইনজীবীদের মাধ্যমেই সমন জারির অনুমতি দেওয়া হয়। সেই আবেদনের দুই দিনের মাথায় আদানিদের আইনজীবীরা সরাসরি নতিস্বীকার করে সমন গ্রহণ করেন।
অভিযোগের নেপথ্যে কী?
আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে করা মার্কিন এই মামলার মূল অভিযোগ হলো বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান। এসইসির দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বরের অভিযোগে দেখা যায় যে আদানিরা ভারতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কার্যাদেশ নিশ্চিত করতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রায় ২৫ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার একটি মাস্টারপ্ল্যান করেছিলেন।
এই প্রকল্পের বিপরীতে মূলধন সংগ্রহ করতে আদানি গ্রিন এনার্জি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে থেকে প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে। কিন্তু বন্ড ইস্যু করার সময় দেওয়া নথিপত্রে আদানিরা কোম্পানিটির দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং নীতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন বলে এসইসি-র অভিযোগ। এসইসি-র মতে, এই বিনিয়োগ মূলত প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে সম্পন্ন হয়েছে, যা মার্কিন সিকিউরিটিজ আইনের চরম লঙ্ঘন।
সামগ্রিকভাবে, আদানিদের এই সমন গ্রহণ ভারতীয় এবং বৈশ্বিক শিল্প মহলে বড় একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এই গোষ্ঠীকে মার্কিন আদালতের বারান্দায় দাঁড় করানোর ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হতে পারে। আগামী তিন মাস আদানি গোষ্ঠী ও তাঁদের হাই-প্রোফাইল আইনজীবীরা অভিযোগ মোকাবিলায় কোন পথ বেছে নেন, তা দেখতে উন্মুখ হয়ে রয়েছে পুরো বিশ্বের বাণিজ্য জগৎ।
