আজকের আধুনিক ও গতিশীল পৃথিবীতে ‘মাল্টিটাস্কিং’ শব্দটি এক ধরণের আভিজাত্য বা স্মার্টনেসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা একই সাথে ই-মেইল চেক করি, মোবাইলে কথা বলি আবার হয়তো কোনো জরুরি প্রেজেন্টেশনও তৈরি করি। তবে আধুনিক নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞান আমাদের এক ভয়াবহ ও চমকপ্রদ সত্যের মুখোমুখি করেছে। আমরা যা করছি, তা আদতে ‘মাল্টিটাস্কিং’ নয়, বরং ‘টাস্ক-সুইচিং’—আর এই ক্রমাগত সুইচিং আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের মস্তিষ্ক কোনো সুপারকম্পিউটারের মতো ‘প্যারালাল প্রসেসিং’ বা সমান্তরালভাবে একাধিক জটিল কাজ করার সক্ষমতা রাখে না। প্রকৃতপক্ষে, মস্তিষ্ক একই সময়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট জটিল তথ্যের ওপর পূর্ণ ফোকাস বা মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারে। আমরা যখন মনে করি যে আমরা একসঙ্গে দুই কাজ করছি, মস্তিষ্ক তখন অতিদ্রুত একটি কাজ থেকে অন্য কাজে যাতায়াত করে মাত্র। এই ‘সুইচিং’ প্রক্রিয়ার জন্য আমাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশে থাকা ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ নামের এলাকাটি প্রধান ভূমিকা পালন করে।
মস্তিষ্কের ‘সিইও’ ও সুইচিং জট
আমাদের মস্তিষ্কের গঠন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সামনের দিকে থাকা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের জীবনের প্রায় সব ধরণের যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের তদারকি করে। নিউরোসায়েন্টিস্টরা এই অংশকে রূপকভাবে মস্তিষ্কের ‘সিইও’ বলে অভিহিত করেন। ধরুন, আপনি যখন মনোযোগ দিয়ে অফিসে একটি রিপোর্ট লিখছেন, তখন আপনার সিইও-র কাছে কেবল ওই রিপোর্টের ফাইলটি খোলা রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি হঠাৎ ফোন কানে তুলে নিয়ে গল্প শুরু করেন, তবে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিতে হয় আগের ফাইলটি বন্ধ করে কথোপকথনের ফাইলটি লোড করার জন্য।
এই যে আসা-যাওয়ার পথ, এটা অত্যন্ত সরু এবং এটি এক ধরণের জৈবিক যানজটের সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, প্রতিবার মনোযোগ পরিবর্তনের সময় মস্তিষ্কে বিপুল পরিমাণ শক্তি (Glucose) এবং অক্সিজেন ব্যয় হয়। ক্রমাগত এই আসা-যাওয়ার ফলে কাজের গতি কমে যায়, উৎপাদনশীলতা বা প্রডাক্টিভিটি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায় এবং প্রতিটি কাজে ভুলের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকরা একে বলছেন ‘কগনিটিভ ট্যাক্স’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক খাজনা। আমরা সময় বাঁচানোর নেশায় মাল্টিটাস্কিং করলেও আদতে আমাদের সময় অনেক বেশি অপচয় হয়।
ওয়ার্কিং মেমোরি: আমাদের মস্তিষ্কের র্যাম (RAM)
এখন অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে যে, ড্রাইভিং করার সময় বা হাঁটাহাঁটি করার সময় তো আমরা অনর্গল কথা বলি, সেটা কি মাল্টিটাস্কিং নয়? উত্তর হলো— না। আমাদের মস্তিস্কে দুই ধরণের কাজ হয়; একটি হলো স্বয়ংক্রিয় বা ‘অটোমেটিক’ (যেমন হাঁটা বা শ্বাস নেওয়া), অন্যটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক বা ‘অটেনশনাল’। আমরা যখন এমন দুটি কাজ একসঙ্গে করার চেষ্টা করি যাতে বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন (যেমন টাইপিং ও ক্যালকুলেশন), তখনই মস্তিষ্কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
এই কাজগুলো সমন্বয় করার জন্য আমাদের মস্তিষ্কে আছে ‘ওয়ার্কিং মেমোরি’। কম্পিউটারের র্যাম (RAM) যেমন প্রসেসরের কাছে ডাটা সাময়িকভাবে ধরে রাখে, আমাদের ওয়ার্কিং মেমোরিও ঠিক তেমনই কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, টাস্ক-সুইচিং বা দ্রুত কাজ বদলানোর ক্ষমতার সঙ্গে এই মেমোরির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন আপনি অংক করতে করতে মোবাইল ফোনের কোনো তথ্যে মন দেন, তখন মস্তিষ্ককে পূর্ববর্তী মেমোরি থেকে অংকের সূত্রগুলো সাময়িকভাবে ‘ফ্লাশ’ বা মুছে ফেলে নতুন তথ্য লোড করতে হয়। এই ‘লোড-আনলোড’ প্রক্রিয়াটি মানুষকে শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দেয়। যাঁদের ওয়ার্কিং মেমোরি জন্মগতভাবে বা প্রশিক্ষণের কারণে শক্তিশালী, তাঁরা হয়তো সুইচিং কিছুটা ভালো করতে পারেন; তবে প্রকৃতিগতভাবেই সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা অত্যন্ত চাপের।
মনোযোগের স্পটলাইট ও তথ্যবিভ্রাট
স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মনোযোগ এক ধরণের ‘স্পটলাইটের’ মতো। অন্ধকারের মধ্যে সার্চলাইটের আলো যেমন এক সময়ে কেবল একটি বিশেষ জায়গা বা ব্যক্তিকে আলোকিত করে, মনোযোগও তেমনি যেকোনো একমুখী হয়ে থাকে। পাবমেডের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের মনোযোগ প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের ‘বাইরের জগৎ’ এবং মনের ভেতরে বয়ে চলা ‘ভেতরের জগতের’ মধ্যে যুদ্ধ করে। ক্লাসে শিক্ষকের বক্তব্য শুনতে শুনতে আপনি যখন আগামীকালের বিকেলের নাস্তার কথা ভাবেন, তখন মনোযোগের এই সুইচিং মুহূর্তের মধ্যে ঘটে। ফলস্বরূপ আপনি শিক্ষক প্রদত্ত জরুরি তথ্যের একাংশ সম্পূর্ণভাবে মিস করেন। এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘কগনিটিভ কন্ট্রোল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণের বিচ্যুতি। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন এই স্পটলাইটকে বারবার ভিন্নপথে ধাবিত করছে, যা আমাদের মেধার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।
মস্তিষ্কের ব্যায়াম: সমাধান লুকিয়ে ‘ডুয়াল এন-ব্যাক’ প্রশিক্ষণে
মস্তিষ্কের এই ক্রমবর্ধমান ক্লান্তি এবং মনোযোগহীনতা কি আদৌ ফেরানো সম্ভব? স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্ক অনেকটা পেশির মতো—নিয়মিত ব্যায়াম করলে এর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এখানে ‘ডুয়াল এন-ব্যাক’ (Dual N-back) নামে একটি প্রশিক্ষণের কথা বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে বেশ ইতিবাচকভাবে উঠে এসেছে। এটি এক বিশেষ ধরণের নিউরোসাইকোলজিক্যাল গেমিং ট্রেনিং, যা আপনার মগজের ‘র্যাম’ তথা ওয়ার্কিং মেমোরিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
ডুয়াল এন-ব্যাক গেমে একই সঙ্গে দুটি উদ্দীপনা বা তথ্যের উৎস থাকে। স্ক্রিনে বাক্সের অবস্থান মনে রাখতে হয় (ভিজ্যুয়াল) এবং হেডফোনে একই সময়ে ভিন্ন অক্ষর বা ধ্বনি শুনতে হয় (অডিও)। অংশগ্রহণকারীকে বলতে হয় কয়েক ধাপ আগে ঠিক ওই মুহূর্তে অডিও এবং ভিডিও’র কম্বিনেশনটা কী ছিল। শুনতে অত্যন্ত জটিল মনে হলেও, প্রতিদিন এই ধরণের অনুশীলনের ফলে আমাদের নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে নতুন এবং মজবুত সংযোগ (Synapses) তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্যায়ামে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের ‘ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স’ বা জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও অ্যালঝেইমার্স প্রতিরোধে সুফল
বর্তমানে উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্মৃতি হারানো বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা (Cognitive Decline) বাড়ছে। বাৰ্ধক্যে মনোযোগ কমে যাওয়া কেবল মেজাজ খিটখিটে করে না, এটি সরাসরি অ্যালঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রবীণ ব্যক্তিরা যদি নিয়মিত মস্তিষ্কের ব্যায়াম বা ওয়ার্কিং মেমোরি ট্রেইনিং করেন, তবে তাঁদের স্মৃতিশক্তির ক্ষয় প্রক্রিয়া মন্থর হয়। যখন মস্তিষ্ক কঠিন কোনো গেম বা টাস্ক সমাধান করে, তখন তা নতুন নতুন নিউরাল পাথওয়ে বা স্নায়বিক পথ তৈরি করে। এর ফলে বার্ধক্যজনিত ‘মস্তিস্ক কুঁচকে যাওয়া’ রোধ হয় এবং মানুষকে দীর্ঘ সময় কর্মক্ষম রাখে।
সতর্কবাণী ও ভবিষ্যতের পথচলা
বাংলা রয়টার্সের বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, মাল্টিটাস্কিং আসলে মানুষকে আরও মেধাবী করে না, বরং এটি আমাদের ক্রমান্বয়ে বিদ্ধস্ত করে। ডিজিটাল যুগে বেঁচে থাকতে হলে মনোযোগ বাড়ানো একটি বড় লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা মনে করেন, একসঙ্গে সব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া এবং ‘মনো-টাস্কিং’ বা এক সময়ে একটি কাজ নিখুঁতভাবে করার অভ্যাস করাই বুদ্ধিমানের কাজ। গভীর মনোসংযোগ (Deep Work) দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের মেধার উৎকর্ষ ঘটায়, যা সারাক্ষণ নোটিফিকেশনে ব্যস্ত থাকলে কখনো সম্ভব হয় না।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘক্ষণ মোবাইলে একাধিক কাজ না করে পড়ার টেবিলে ফোকাস ঠিক রাখা কিংবা কাজের সময় মনোযোগ একীভূত করাই হতে পারে ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ দক্ষতা। তাই আপনার মস্তিষ্কের সিইও-কে বা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে অযথা খাটিয়ে নিঃশেষ না করে এর যত্নের জন্য বিশেষ ওয়ার্কিং মেমোরি ব্যায়ামের চর্চা আজ থেকেই শুরু করা উচিত। কারণ শক্তিশালী মস্তিষ্কই শক্তিশালী আগামীর মূল ভিত্তি।
