সভ্যতা যতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা প্রযুক্তির চরম শিখরে আরোহণ করুক না কেন, মানুষের হৃদয়ের আবেগ এবং সম্পর্কের জটিলতাগুলো আজও অপরিবর্তিত। তবে যাপিত জীবনের ধরণ এবং ডিজিটাল আসক্তির যুগে সম্পর্কের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে ব্যাপকভাবে। ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে দম্পতিরা কীভাবে নিজেদের প্রেমের স্পার্ক ধরে রাখবেন এবং পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচিয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবেন, তা নিয়ে বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্বখ্যাত রিলেশনশিপ কোচ, লেখক ও প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার জিলিয়ান টুরেকি।
ইনস্টাগ্রামে ৩৫ লাখেরও বেশি অনুসারী সমৃদ্ধ এই তারকা রিলেশনশিপ কোচ প্রায় দুই দশক ধরে মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিরসনে কাজ করে চলেছেন। তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘জিলিয়ান অন লাভ’ (Jillian on Love) বর্তমানে সারা বিশ্বের তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ দম্পতিদের কাছে এক নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা। সম্প্রতি জিলিয়ান ২০২৬ সালের আধুনিক বাস্তবতায় সুখী সম্পর্কের পাঁচটি প্রধান ভিত্তি সম্পর্কে তাঁর অনুসারীদের অবহিত করেছেন।
জিলিয়ান বলেন, “সম্পর্কের চাবিকাঠি অন্য কারো হাতে নেই, এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে হবে। বর্তমান সময়ে আমরা সঙ্গীর ছোট ভুলকেও বিশাল করে দেখার প্রবণতায় ভুগি। নেতিবাচক কিছু অনুমান করে নেওয়ার আগেই অপর পক্ষকে প্রশ্ন করার বা খোলামেলা আলোচনা করার সাহস রাখুন। সঙ্গীকে এমনভাবে ভালোবাসুন যেন তার মনে গভীর নিরাপত্তা, নিশ্ছিদ্র আস্থা এবং গভীর যোগাযোগের অনুভূতি তৈরি হয়।”
নিচে ২০২৬ সালে একটি টেকসই ও মধুর সম্পর্কের জন্য জিলিয়ান টুরেকির পাঁচটি অনবদ্য পরামর্শ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সুস্থ জীবনধারা ও যৌথ সক্রিয়তা: ‘হাঁটুন মাইলকে মাইল’
২০২৬ সালের ডিজিটাল পরিমণ্ডলে মানুষ দিন দিন ঘরবন্দী ও অসামাজিক হয়ে পড়ছে। জিলিয়ানের প্রথম পরামর্শটি খুবই সাদামাটা কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন— সম্পর্কে ছন্দ বজায় রাখতে একসঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটুন। তাঁর মতে, সপ্তাহে অন্তত ৪ দিন দম্পতিদের একসঙ্গে ৮ হাজার কদম হাঁটা উচিত।
কেবল ৮ হাজার কদম হাঁটাই শেষ কথা নয়; এটি আসলে শারীরিক সুস্থতার চেয়ে মানসিক সংযোগ তৈরির একটি শক্তিশালী উপায়। হাঁটার সময় কোনো স্মার্টফোন বা বাহ্যিক শব্দ থাকে না, থাকে কেবল একে অপরের সঙ্গ এবং প্রকৃতি। এটি দুজনের মধ্যে হৃদ্যতা এবং এক ধরণের অবলীলা ছন্দের জন্ম দেয়। এছাড়াও একসঙ্গে জিমে যাওয়া, সপ্তাহান্তে ব্যাডমিন্টন বা দাবার মতো প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় অংশ নেওয়া কিংবা বৃষ্টিভেজা দিনে সিনেমা দেখার মতো অভ্যাসগুলো সম্পর্কের হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফেরাতে টনিকের মতো কাজ করে। এটি দুজনের ভেতর এমন হরমোন নিঃসৃত করে যা একে অপরের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক।
২. বিয়ের বছরগুলোতেও অমলিন থাক ‘ডেট নাইটস’
আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বিয়ের কয়েক বছর পরই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ডেটিং বা ঘটা করে কোথাও যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে যায়। ২০২৬ সালের আধুনিক প্রেমও এই একই বিপদে পড়তে পারে যদি না দম্পতিরা সজাগ থাকেন। জিলিয়ান পরামর্শ দেন, সম্পর্ক যত বছরেরই হোক— এমনকি দুই বা তিন দশক পেরিয়ে গেলেও— একে অপরকে ডেট করতে ভুলবেন না।
নতুন প্রেমের শুরুতে যেমন আমরা পরিপাটি করে সাজতাম এবং প্রিয়জনকে চমক দেওয়ার চেষ্টা করতাম, সেই রেশ ধরে রাখাই হলো আসল কায়দা। মাঝে মাঝে কেবল দুজনে সুন্দর পোশাক পরে বাইরে রাতের খাবারের জন্য যান। কোনো বিশেষ দিবস ছাড়াই ড্রয়িংরুমে কফি হাতে নিয়ে বসে মাঝরাত অবধি পুরোনো দিনের মতো অমূলক আলাপ করুন। এই ‘ডেটিং সংস্কৃতি’ বজায় রাখা আপনাদের এটিই মনে করিয়ে দেবে যে, আপনারা কেবল সংসার যাপনের চাকা ঘোরানোর সঙ্গী নন, আপনারা একে অপরের প্রথম ভালোবাসা।
৩. সক্রিয় শ্রবণ এবং ‘ইমোশনাল অ্যাভেইলিবিলিটি’ বা আবেগপ্রবণ সহজলভ্যতা
২০২৬ সালে দম্পতিদের মাঝে সবচাইতে বড় অভিযোগটি হচ্ছে— ‘সঙ্গী কাছে থেকেও নেই’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রল আর ভার্চুয়াল দুনিয়া আমাদের আবেগীয় সংযোগকে ছিঁড়ে দিচ্ছে। জিলিয়ান এই প্রবণতাকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সম্পর্কে সবচাইতে বড় চাহিদা হলো ‘আবেগপ্রবণ সহজলভ্যতা’।
কেবল “কেমন আছো? খেয়েছ কি?” এই জাতীয় রুটিন প্রশ্নের বাইরে যান। সঙ্গীর গভীর আকাঙ্ক্ষা, কর্মক্ষেত্রের চাপা উত্তেজনা, এমনকি পুরোনো কোনো মানসিক আঘাত (Trauma) সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। মন দিয়ে শুনুন সঙ্গী কোনো বিশেষ বিষয়ে বিপন্ন বা নিরাপত্তাহীন বোধ করছে কি না। তাকে অনুভব করান যে, যখন সে আপনার সামনে আছে, তখন পৃথিবীর আর কোনো আকর্ষণ আপনার কাছে তার চেয়ে বড় নয়। জিলিয়ানের ভাষায়, “সাফল্যের প্রথম ধাপ হলো সঙ্গীর নীরব কথাগুলোও অনুধাবন করতে শেখা।”
৪. নিজস্বতা বজায় রাখা ও সম্মানজনক ‘বাউন্ডারি’
২০২৬ সালে রিলেশনশিপ কোচদের অন্যতম প্রধান ইস্যু হলো ‘পার্সোনাল স্পেস’ বা ব্যক্তিগত পরিসর। ভালোবাসা মানেই এই নয় যে সঙ্গীর ওপর সারাক্ষণ নির্ভরশীল হওয়া বা তাঁর সবকিছুর খবরদারী করা। জিলিয়ান টুরেকি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রতিটি মানুষের নিজের জন্য একটি ‘হেলদি বাউন্ডারি’ বা সুস্থ সীমারেখা থাকা জরুরি।
সম্পর্কের বাইরেও আপনাদের একেকজনের আলাদা জীবন, বন্ধুমহল এবং শখ থাকতে পারে। একে অপরের ওপর পাহাড়প্রমাণ অধিকার খাটানোর চেয়ে সেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান দিন। সঙ্গী যখন একা থাকতে চায় কিংবা নিজের শখের কোনো কাজ করতে চায়, তাকে সেই স্বাধীনতা দিন। এতে সম্পর্কে একঘেয়েমি কাটে এবং ফিরে আসার পর আকর্ষণ আরও বাড়ে। জিলিয়ানের মতে, সম্মানজনক দূরত্ব ভালোবাসা বুনতে সাহায্য করে, ভেঙে ফেলতে নয়।
৫. ছোট ছোট প্রশংসা ও ‘টিম স্পোর্ট’ মানসিকতা
বিয়ের দীর্ঘস্থায়ীত্ব বড় কোনো আকাশচুম্বী ত্যাগের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা দাঁড়িয়ে থাকে ছোট ছোট স্বীকৃতি ও স্বীকৃতির ওপর। জিলিয়ান বলেন, প্রতিদিন সঙ্গীর অন্তত একটি গুণের বা কাজের ছোট প্রশংসা করুন। রান্না ভালো হলে জানানো, অফিসে সফল কোনো মিটিং শেষ করার স্বীকৃতি দেওয়া কিংবা কোনো বিপদে মানসিক শক্তির প্রশংসা করা— এই ছোট ছোট ইনজেকশন সম্পর্কের বিষক্রিয়া ধ্বংস করে দেয়।
জিলিয়ান টুরেকির সবচেয়ে মূল্যবান উক্তি হলো— “দাম্পত্য বা ভালোবাসা হলো একটি টিম স্পোর্ট।” অর্থাৎ এটি কোনো একপক্ষীয় যুদ্ধ নয়। আপনি যদি সবসময় ‘আমি’ শব্দে আটকে থাকেন, তবে দীর্ঘ মেয়াদে হার নিশ্চিত। যদি আপনি নিজেকে আপনার দলের বা অর্ধাঙ্গীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে না ভাবেন এবং গোল করতে অপর পক্ষকে সহায়তা না করেন, তবে আধুনিক বিয়ের সমীকরণ মেলানো কঠিন। নিজেদের সাফল্যে যেমন আনন্দ করবেন, সঙ্গীর ব্যর্থতায় ঢাল হিসেবে দাঁড়ানোই ২০২৬ সালে টেকসই সম্পর্কের আসল লক্ষণ।
২০২৬ সালের অস্থির এই ভূখণ্ডে যখন সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করা মানুষের হাতের কাছে সব সময় হাজারো উপকরণ মজুত রয়েছে, তখন সচেতনভাবে একাত্ম থাকাটাই বীরত্বের কাজ। জিলিয়ান টুরেকির এই পরামর্শগুলো অনুসরণ করা কেবল রোমান্টিক হওয়া নয়, বরং তা সুস্থ মস্তিস্ক ও হৃদয়ের জন্য একটি অতিপ্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। আধুনিক যুগে মানুষের পাশে মানুষ থাকাটাই হোক ২০২৬ সালের বড় সংকল্প। সম্পর্কে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনুন এবং তুচ্ছ ভুলের ওপর দীর্ঘস্থায়ী তিক্ততা না বাড়িয়ে ক্ষমার মহানুভবতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
