রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার ঢাকা-৬ আসন। সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালি থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকায় এখন বইছে ভোটের হাওয়া। তবে এই আসরের নির্বাচনী চিত্রটি বেশ বৈচিত্র্যময় এবং কিছুটা বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে যেমন রয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা, অন্যদিকে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আর্থিক সংকট এবং নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। বিশেষ করে ছোট দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রচারণার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় দলগুলোর কর্মী-সমর্থকদের ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য।
ঢাকা-৬ আসনে ‘হারিকেন’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী মো. আকতার হোসেন। কিন্তু তাঁর নির্বাচনী যাত্রার শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। বাংলা রয়টার্সের সাথে আলাপকালে তিনি তাঁর মনের ক্ষোভ ও সংকটের কথা তুলে ধরেন। আকতার হোসেন জানান, প্রচারণার শুরুতে লিফলেট বিলি করতে গিয়ে তাঁকে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্য একটি প্রভাবশালী দলের কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গোক্তি করছে এই বলে যে, “বাংলাদেশ মুসলিম লীগ তো ব্রিটিশ আর পাকিস্তান আমলেই মারা গেছে, এখন আবার একে জাগিয়ে তোলার কী দরকার?”
আকতার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ও বিদ্রূপের কারণে আমাদের কর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত বোধ করছেন। তবে আমি দমে যাওয়ার পাত্র নই। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার বিশ্বাস, শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমি ৫ থেকে ১০ হাজার ভোট পেতে পারি।”
ঢাকা-৬ আসনের অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। নারিন্দা, ধোলাইখাল, লক্ষ্মীবাজার থেকে শুরু করে বংশাল পর্যন্ত এলাকাগুলোতে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানারের ছড়াছড়ি। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ইশরাক হোসেন (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুল মান্নানের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে সাধারণ ভোটারদের ধারণা। এই দুই প্রার্থীর প্রচারণার তুলনায় অন্য পাঁচজন প্রার্থী অনেকটাই নিষ্প্রভ। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা যেভাবে বড় বড় বিলবোর্ড এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন, অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না।
নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চেয়েও আদর্শকে বড় করে দেখছেন গণফ্রন্টের প্রার্থী আহম্মেদ আলী শেখ। পেশায় আইনজীবী এই প্রার্থী ‘মাছ’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর প্রার্থিতার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণকে তাঁদের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। আহম্মেদ আলী শেখ বলেন, “আমি জানি আমার জয়ের সম্ভাবনা কতটা, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের দায়িত্বের কথা পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আমি নিয়মিত জনসংযোগ করছি এবং মানুষের ভালো সাড়া পাচ্ছি।”
অন্যদিকে, আর্থিক সংকটের কারণে ব্যানার-ফেস্টুন তৈরি করতে না পারার আক্ষেপ জানিয়েছেন গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম। ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে লড়া এই তরুণ নেতা জানান, বড় বড় প্রার্থীদের মতো অর্থবল না থাকায় তিনি ডিজিটাল প্রচারণায় বেশি জোর দিচ্ছেন। তবে তৃণমূল পর্যায়ে দৃশ্যমান প্রচারণা না থাকায় অনেক ভোটারই তাঁর নাম বা প্রতীক সম্পর্কে অবগত নন।
একই সুর শোনা গেছে জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) প্রার্থী আমির উদ্দিন আহমেদের কণ্ঠে। তিনি নিজেকে ‘গরিব প্রার্থী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “বড় দলগুলোর প্রার্থীদের অঢেল টাকা। তাঁরা যেভাবে শোডাউন করছেন, আমাদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। আমরা মূলত মসজিদ-মাদ্রাসা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ভোট চাইছি।”
তবে প্রচারণার এই সংকটের মাঝেও সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুরে কথা বলেছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. ইউনূস আলী আকন্দ। ‘ডাব’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই প্রার্থী তাঁর পরিচিতি নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত। বাংলা রয়টার্সকে তিনি বলেন, “আমাকে চেনে না বাংলাদেশে এমন কেউ আছে? সারা দেশের সচেতন মানুষ, পুলিশ, প্রশাসন, আমলা এবং রাজনৈতিক নেতারা—সবাই আমাকে চেনে। আমার আলাদা করে প্রচারণার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।” তাঁর এই আত্মবিশ্বাস রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা-৬ আসনের সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা মূলত বড় প্রার্থীদের নিয়েই বেশি ভাবছেন। সূত্রাপুর এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা পোস্টার দেখে প্রার্থীদের চিনি। এখানে ইশরাক হোসেন আর আবদুল মান্নানের পোস্টারই বেশি। অন্য প্রার্থীদের তো চেনাই যাচ্ছে না।” বংশালের আরেক ভোটারের মতে, “ছোট দলের প্রার্থীরা শুধু সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, প্রচারণায় তাঁদের তেমন কোনো প্রভাব নেই।”
ঢাকা-৬ আসনে প্রায় তিন লাখ ভোটারের রায় কার দিকে যাবে, তা সময় বলে দেবে। তবে নির্বাচনী মাঠের এই চিত্র বলে দেয় যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছোট দলগুলোর অংশগ্রহণ যতটা না জয়ের জন্য, তার চেয়ে বেশি টিকে থাকার সংগ্রামের জন্য। আর্থিক দৈন্যদশা এবং রাজনৈতিক বড় শক্তিগুলোর তুচ্ছতাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে এই প্রার্থীরা যখন মাঠে থাকেন, তখন তা বহুদলীয় গণতন্ত্রের একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলে। তবে এই অসম লড়াইয়ে ছোট দলের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
