দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চীন ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি নতুন আঞ্চলিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চললেও, এবার তাতে যোগ হয়েছে মিয়ানমার। ঢাকা ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তান সম্প্রতি বাংলাদেশ, চীন এবং মিয়ানমারকে নিয়ে একটি ‘চতুর্দেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো’ গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা এই মুহূর্তে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে না গিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে।
নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রমতে, গত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তান এই চার দেশীয় বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠায়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই ইসলামাবাদে চার দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রাথমিক বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সাথে প্রায় ১৫ মিনিটব্যাপী টেলিফোনে বিস্তারিত আলাপ করেন। এই ফোনালাপটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যার মাত্র দুই দিন পরেই মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান সুয়ে ইসলামাবাদ সফরে যান। ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তান ও চীন এই জোট গঠনের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তাদের প্রভাব বলয় আরও সংহত করতে চাইছে।
তৌহিদ হোসেন ও ইসহাক দারের মধ্যকার ফোনালাপে কেবল আঞ্চলিক জোট নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘ ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া, যা গত ২৯ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এছাড়া করাচি ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করা এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের তৈরি ‘জেএফ-১৭’ (JF-17) যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকট। ইসহাক দার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে জানতে চান, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি উত্থাপন করবেন কি না এবং এ বিষয়ে ঢাকার চাওয়া কী। জবাবে তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করেন যে, রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে পাকিস্তান যদি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশ তাকে স্বাগত জানাবে।
এই নতুন প্রস্তাবটি মূলত গত সাত মাস ধরে চলা একটি ব্যর্থ চেষ্টার নতুন রূপ। এর আগে চীন ও পাকিস্তান মিলে বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ‘ত্রিদেশীয় জোট’ গঠনের চেষ্টা চালিয়েছিল। গত বছরের জুনে চীনের কুনমিংয়ে এ বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ তখন সরাসরি সেই জোটে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, কেবল তিনটি দেশ নিয়ে এমন জোট ভারসাম্যপূর্ণ হবে না; এতে শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো চতুর্থ কোনো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সেই প্রেক্ষিতেই এবার মিয়ানমারকে যুক্ত করে চার দেশীয় কাঠামোর প্রস্তাব এসেছে। যদিও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ইস্যু এবং সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে, তবুও চীন ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারকে এই টেবিলে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই জোটের প্রস্তাবটিকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও টাইমিং বা সময় নির্ধারণ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, পাকিস্তান ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই এই বৈঠকটি করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। তবে তিনি ইসলামাবাদকে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে এবং সামনেই জাতীয় নির্বাচন। তাই এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জোটে যুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন।
তবে আলোচনার পথ খোলা রাখতে বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে যে, প্রথম দফার বৈঠকটি অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ে হতে পারে এবং তা নির্বাচনের পরে সুবিধাজনক সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এবং ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে চীন অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানও নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারকে এই জোটে রাখা চীনের কৌশলী চাল হতে পারে, যাতে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে তাদের একটি নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত হয়।”
হুমায়ুন কবির আরও সতর্ক করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এমন কোনো জোটে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া ঠিক হবে কি না, তা গভীরভাবে ভাবা দরকার। কারণ এর সাথে কেবল আঞ্চলিক রাজনীতি নয়, বরং ভারত ও আমেরিকার মতো বড় শক্তির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণও জড়িয়ে আছে।”
পাকিস্তান-চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ—এই চতুর্দেশীয় অক্ষ যদি সত্যিই বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোতে একটি বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিতে পারে। একদিকে এটি যেমন বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দ্বার খুলে দিতে পারে, অন্যদিকে এটি ভারতকে কৌশলগতভাবে কিছুটা চাপে ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনের পর আসা নতুন সরকার এই জটিল কূটনৈতিক চালের বিপরীতে কী অবস্থান নেয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে অত্যন্ত হিসেবি চাল চালছে, তা স্পষ্ট।
