লোকসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

লোকসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

বাংলার লোকজ সংস্কৃতির আকাশে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে পাড়ি জমালেন প্রখ্যাত বাউল সাধক ও গুণী সংগীতশিল্পী সুনীল কর্মকার। আজ শুক্রবার ভোর ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। গত কয়েক দিন ধরে তিনি ফুসফুসের জটিল সংক্রমণসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে, বিশেষ করে বাউল ও লোকসংগীত মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম (আসলাম) বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকারের মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শুক্রবার ভোররাতে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন। মরদেহ বর্তমানে ময়মনসিংহ নগরীর আঠারোবাড়ি এলাকায় রাখা হয়েছে। শিল্পীর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও গুণগ্রাহীদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ দুপুরে তাঁর মরদেহ ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে রাখা হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে জেলার গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া এলাকায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।

১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বার্নাল গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুনীল কর্মকার। তাঁর পিতা দীনেশ কর্মকার এবং মাতা কমলা কর্মকার। শৈশব থেকেই গানের প্রতি এক সহজাত আকর্ষণ ছিল তাঁর। তবে শৈশবেই এক মর্মান্তিক টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে হারান চোখের দৃষ্টি। পৃথিবীর দৃশ্যমান আলো নিভে গেলেও তিনি মুষড়ে পড়েননি; বরং গানের সুরকেই করে তুলেছিলেন তাঁর জীবনের পথচলার একমাত্র আলো। মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গানের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ক্রমে হয়ে ওঠেন বাংলার প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর।

সুনীল কর্মকার কেবল একজন গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সংগীতজ্ঞ। তাঁর ভরাট এবং আবেগময় কণ্ঠের জাদুতে যেকোনো আসর মুহূর্তেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত। দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও বাদ্যযন্ত্রের ওপর তাঁর দখল ছিল বিস্ময়কর। বেহালা, দোতারা, তবলা এবং হারমোনিয়াম—প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রই তিনি সমান দক্ষতায় বাজাতে পারতেন। সুরের কান এবং তালজ্ঞানের কারণে তিনি সমসাময়িক বাউল শিল্পীদের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। লোকসংগীতের আসরে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল আধ্যাত্মিক এবং লৌকিক সুরের এক অপূর্ব মিলনমেলা।

সুনীল কর্মকার ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। জালাল খাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানে তিনি নিজ মেধার স্বাক্ষর রেখে সুরারোপ করেছেন এবং কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। এছাড়া তাঁর নিজস্ব সৃজনী প্রতিভা ছিল অপরিসীম। তিনি নিজ হাতে প্রায় দুই শতের কাছাকাছি গান রচনা করেছেন। বাউল গান ছাড়াও তিনি মালজোড়া গান, মহাজনি গান এবং আবহমান গ্রামবাংলার লোকসংগীতের প্রসারে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর রচিত গানগুলোতে আধ্যাত্মিকতা, মরমীবাদ এবং জীবনের গূঢ় সত্য ফুটে উঠত।

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মাননা ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক’ লাভ করেন। এই সম্মাননা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং এটি ছিল প্রান্তিক বাউল শিল্পীদের দীর্ঘ সংগ্রামের এক প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশ-বিদেশের নানা মঞ্চে গান গেয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন এবং বাংলার মাটির গানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন।


ময়মনসিংহ বিভাগীয় বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “সুনীল কর্মকার কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ধারক ও বাহক। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ দরদ আর একতারা-দোতারার ছন্দ শ্রোতাদের সরাসরি আত্মার সাথে সংযোগ ঘটিয়ে দিত। গানই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। তিনি ছিলেন আমাদের বাউল সমাজের অভিভাবক।”

ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক মহলের মতে, সুনীল কর্মকারের চলে যাওয়া মানে একটি শক্তিশালী কণ্ঠের নীরবতা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ সংগীত অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর প্রয়াণে স্থানীয় কবি, শিল্পী এবং বাউল সমাজের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাঁরা বলেন, সুনীল কর্মকারের সুর ও বাণী আগামী প্রজন্মের বাউল সাধকদের পাথেয় হয়ে থাকবে।

বাংলার মরমী সাধনার এই মহান শিল্পীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছে ‘বাংলা রয়টার্স’ পরিবার। তাঁর গান ও সুর চিরকাল বেঁচে থাকবে বাঙালির হৃদয়ে, মেঠো পথের বাঁকে আর বাউল আসরের সুরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন