রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ক্ষত ও নারীর অন্তহীন প্রতিরোধের আখ্যান

রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ক্ষত ও নারীর অন্তহীন প্রতিরোধের আখ্যান

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার হল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক অন্যরকম স্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল। মঞ্চের আলো-আঁধারিতে যখন এক নারী ফটোসাংবাদিকের জীবনের চরম সংকট ও রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নির্মমতার গল্প উন্মোচিত হচ্ছিল, দর্শক সারিতে বসে থাকা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তখন অনুভূত হচ্ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত। নাট্যদল ‘অবলোকন’ মঞ্চে এনেছে তাদের নতুন প্রযোজনা ‘গন্ধসূত্র’। নাট্যকার অপু শহীদের তীক্ষ্ণ লেখনী এবং তৌফিকুল ইসলামের বলিষ্ঠ নির্দেশনায় নাটকটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং বর্তমান সময়ের এক নির্জলা রাজনৈতিক দস্তাবেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নাটকটির তৃতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আজ শুক্রবার একই মঞ্চে রয়েছে এর চতুর্থ প্রদর্শনী। রাষ্ট্রীয় ছত্রচ্ছায়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং শেষ পর্যন্ত একজন লাঞ্ছিত মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার খোঁজার চেষ্টা— এই ত্রিমাত্রিক সংকটকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে ‘গন্ধসূত্র’।

‘গন্ধসূত্র’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন সাহসী নারী ফটোসাংবাদিক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি এমন এক সহিংসতার শিকার হন, যার পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে রাষ্ট্রের শক্তিশালী কোনো পক্ষের সমর্থন ছিল। এই ট্রমা বা মানসিক ক্ষত তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে তখন, যখন তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে নিজের গৃহকোণেই সেই নির্যাতককে শনাক্ত করেন।

আইন, আদালত এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলা সেই নারী তখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। তিনি কি রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে ন্যায়বিচারের জন্য আজীবন অপেক্ষা করবেন, নাকি নিজ হাতেই সেই হিসাব চুকিয়ে দেবেন? নাটকটি এখানে ক্ষমতা, শরীরী রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্কের সমীকরণকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

নাট্যকার অপু শহীদ জানান, ‘গন্ধসূত্র’ রচনার পেছনে বিশ্বখ্যাত আর্জেন্টাইন-আমেরিকান নাট্যকার এরিয়েল ডর্ফম্যানের কালজয়ী নাটক ‘ডেথ অ্যান্ড দ্য মেইডেন’ একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ডর্ফম্যানের সেই নাটকেও একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর এক নির্যাতিত নারীর ব্যক্তিগত প্রতিশোধের গল্প উঠে এসেছিল। অপু শহীদ সেই বৈশ্বিক থিমকে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পটভূমিতে সফলভাবে দেশীয় রূপ দান করেছেন।

নাট্যকারের ভাষায়, “সময়কে কেবল চোখে দেখা বা কানে শোনা যায় না; সময়ের এক অদ্ভুত গন্ধ থাকে। সেই গন্ধ দিয়েই আমরা সময়কে চিনে নিই। ‘গন্ধসূত্র’ সেই গন্ধেরই এক শিল্পরূপ। এটি কেবল কোনো কল্পলোকের গল্প নয়; বরং দেশে দেশে, নগরে নগরে ঘটে চলা নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন। আজ যা ঘটছে, তা কালও ঘটবে যদি না আমরা এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারি।”

নাটকটির নির্দেশক তৌফিকুল ইসলাম তাঁর নির্দেশকীয় ভাবনায় অত্যন্ত সাহসী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রথমবার যখন পাণ্ডুলিপিটি হাতে পাই, তখন একধরনের স্নায়বিক ধাক্কা অনুভব করেছিলাম। মনে হয়েছিল, এই গল্পটি আমাদের বলতেই হবে। এটি কেবল বাংলাদেশের গল্প নয়; বরং পৃথিবীর যেখানেই গণতন্ত্র ধসে পড়ছে এবং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা জেঁকে বসছে, সেখানকার সাধারণ মানুষের বাস্তবতাই এখানে মূর্ত হয়েছে।”

মঞ্চায়নের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি জানান, পশ্চিমা নাট্যতত্ত্বে সহিংসতা বা যৌনতাকে যেভাবে সরাসরি উপস্থাপন করা হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কিছুটা ভিন্ন। দেশীয় দর্শকদের রুচি ও সামাজিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে সংলাপ এবং শরীরী ভাষা কিছুটা পরিশীলিত করা হয়েছে, যাতে বার্তার তীব্রতা না কমিয়েও তা সর্বজনগ্রাহ্য হয়। নাট্যকারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে এই পরিমার্জন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আশির ও নব্বইয়ের দশকে ঢাকার নাট্যপাড়ায় ‘অবলোকন’ ছিল এক পরিচিত নাম। দীর্ঘকাল দলটির কার্যক্রম স্থবির থাকলেও গত বছর পুরোনো সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দলটি পুনর্গঠিত হয়। নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের সাথে নিয়ে তারা পুনরায় নিয়মিত নাট্যচর্চায় ফিরছে। ‘গন্ধসূত্র’ তাদের এই নতুন যাত্রার দ্বিতীয় প্রযোজনা। এর আগে তারা মঞ্চে এনেছিল ‘আজকের নোরা’।

বৃহস্পতিবারের প্রদর্শনী শেষে নাট্যবোদ্ধারা বলছেন, ‘গন্ধসূত্র’ নাটকটি আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি ক্ষতকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে একজন ফটোসাংবাদিকের লেন্স যখন নিজেই সহিংসতার শিকার হয়, তখন তথাকথিত ‘বাক-স্বাধীনতা’ যে কতটা ভঙ্গুর, তা নাটকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মঞ্চে অভিনয়শিল্পীদের শক্তিশালী অভিনয় এবং আবহ সংগীতের পরিমিত ব্যবহার নাটকটিকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে।

বর্তমান অস্থির সময়ে যখন নারীর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে, তখন ‘গন্ধসূত্র’র মতো নাটক মঞ্চে আসা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং দর্শকদের ভাবনার খোরাক জোগায়। রাষ্ট্রের কাঠামো যদি অপরাধীকে সুরক্ষা দেয়, তবে ব্যক্তিগত স্তরে ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক জীবন্ত দলিল এই নাটক। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় স্টুডিও থিয়েটার হলে এই নাটকের চতুর্থ প্রদর্শনী দেখার জন্য নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন