এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকসে ইমরানুরের দুর্দান্ত সূচনা

এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকসে ইমরানুরের দুর্দান্ত সূচনা

এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান আসরে বাংলাদেশের হয়ে গৌরবের এক নতুন অধ্যায় রচনার লক্ষ্যে শুভ সূচনা করেছেন দেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান। চীনের শিল্পসমৃদ্ধ শহর তিয়ানজিনে আজ শুরু হওয়া এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় পুরুষদের ৬০ মিটার স্প্রিন্টে নিজের হিটে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্ম ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে ইমরানুর আরও একবার এশিয়ার মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

আজ বৃহস্পতিবার প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী দিনে পুরুষদের ৬০ মিটার স্প্রিন্টের প্রাথমিক হিটে ট্র্যাকে নামেন ইংল্যান্ডপ্রবাসী এই বাংলাদেশি অ্যাথলেট। নির্ধারিত ৬০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে ইমরানুর সময় নিয়েছেন ৬.৭৩ সেকেন্ড। এই হিটে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাপানের শক্তিশালী স্প্রিন্টার কিরিউ ইয়োশিহিদে। জাপানি এই অ্যাথলেট ৬.৬৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে হিটে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি হিট থেকে শীর্ষ চারজন অ্যাথলেট সরাসরি সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেই সুবাদে ইমরানুর অত্যন্ত দাপটের সাথে তাঁর জায়গা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর হিটে তৃতীয় ও চতুর্থ হয়ে সেমিফাইনালের টিকিট পেয়েছেন যথাক্রমে হংকংয়ের কোওক চুন টিং এবং সৌদি আরবের আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ দাউদ।

ইমরানুর রহমানের নাম বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর ২০২৩ সালের অভাবনীয় সাফল্যের জন্য। কাজাখস্তানের আস্তানায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকসে ৬০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে পুরো এশিয়াকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। সেটি ছিল এশিয়ান অ্যাথলেটিকসের শীর্ষ স্তরে বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেটের পাওয়া প্রথম এবং একমাত্র স্বর্ণপদক। তাঁর সেই বিজয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালে ইরানের তেহরানে অনুষ্ঠিত আসরেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেবার টাইমিংয়ে সামান্য হেরফের হওয়ায় তাঁকে চতুর্থ স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। তবে চোট এবং বিভিন্ন শারীরিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে তিনি যেভাবে ফিরে এসেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। গত আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় অ্যাথলেটিকসে তিনি পুনরায় দ্রুততম মানবের মুকুট পুনরুদ্ধার করে প্রমাণ করেছিলেন যে, ট্র্যাকে তাঁর আধিপত্য এখনও অটুট।

এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশের সাফল্য কেবল ইমরানুরেই সীমাবদ্ধ নয়, তবে পদক তালিকার সংখ্যাটি বেশ ছোট। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এই মঞ্চ থেকে তিনটি পদক লাভ করেছে। ইমরানুরের স্বর্ণপদক ছাড়াও ২০২৪ সালের আসরে ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে অভাবনীয় নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন জহির রায়হান। তিনি ৪৮.১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে রুপার পদক জয় করেন। একই আসরে হাই জাম্প ইভেন্টে ২.১৫ মিটার উচ্চতা পেরিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন মাহফুজুর রহমান।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশের এই ক্রমবর্ধমান উন্নতি বিদেশের মাটিতে প্রশিক্ষিত অ্যাথলেটদের অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় প্রতিভা বিকাশের একটি ইতিবাচক ফল। ইমরানুর রহমানের মতো অ্যাথলেটরা যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদক জেতেন, তখন দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অ্যাথলেটিকস নিয়ে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়।

আজ বিকেলেই তিয়ানজিনের ট্র্যাকে পুনরায় নামতে হবে ইমরানুরকে। সেমিফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে ফাইনালে ওঠার লড়াইটি মোটেও সহজ হবে না। এশিয়ার সেরা স্প্রিন্টাররা এখন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশেষ করে চীন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অ্যাথলেটরা ইনডোর ট্র্যাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ইমরানুরের অভিজ্ঞ কোচরা মনে করছেন, তাঁর রিঅ্যাকশন টাইম এবং স্টার্টিং যদি নিখুঁত হয়, তবে তিনি ২০২৩ সালের সেই অভাবনীয় সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন।

ইনডোর অ্যাথলেটিকসের ৬০ মিটার স্প্রিন্ট মূলত গতির চেয়েও বেশি কৌশল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার খেলা। ১০০ মিটার স্প্রিন্টের মতো এখানে অনেকটা সময় পাওয়া যায় না গতি বাড়ানোর জন্য। শুরুর কয়েক সেকেন্ডই নির্ধারণ করে দেয় পদকের ভাগ্য। ইমরানুর তাঁর আগের রেকর্ডগুলোয় শুরুর গতিতে বেশ পারদর্শী দেখিয়েছেন।


বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ইমরানুর তাঁর বর্তমান টাইমিং (৬.৭৩ সেকেন্ড) সেমিফাইনালে আরও উন্নত করতে পারবেন। তাঁর ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং ৬.৫৯ সেকেন্ড, যা তিনি কাজাখস্তানে সোনা জেতার পথে অর্জন করেছিলেন। যদি তিনি সেই টাইমিংয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেন, তবে পদক জয়ের লড়াইয়ে তিনি থাকবেন সামনের সারিতে।

চায়নার তিয়ানজিনের এই ইনডোর স্টেডিয়ামে উপস্থিত বাংলাদেশি প্রবাসীরা এবং দেশের কোটি কোটি ক্রীড়াপ্রেমী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বিকালের সেমিফাইনালের জন্য। ইমরানুর কি পারবেন আরও একবার এশিয়ার দ্রুততম মানবের মুকুট নিজের করে নিতে? নাকি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ভিড়ে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে কেবল অভিজ্ঞতায়? উত্তর পাওয়া যাবে আজ বিকেলেই। তবে ফলাফল যাই হোক, ইমরানুর রহমান ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন যে, সীমাবদ্ধ সুযোগের মধ্যেও বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা এশিয়ার সর্বোচ্চ মঞ্চে লড়াই করার সক্ষমতা রাখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন