বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম বর্ণিল এবং রহস্যময় সম্পর্কের কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে নামটি আসে, তা হলো পাতৌদি পরিবারের নওয়াব সাইফ আলী খান এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী অমৃতা সিং। বর্তমান সময়ে বলিউড তারকারা যখন ধর্ম এবং বিশ্বাসের সমীকরণে প্রায়ই সামাজিক বাধার মুখে পড়েন, তখন কয়েক দশক আগেই সাইফ এবং অমৃতা এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যা আজও গবেষক ও অনুরাগীদের আলোচনার খোরাক। কেবল প্রেম এবং বিয়ের নাটকীয়তাই নয়, ভিন্নধর্মী পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সন্তানদের বেড়ে তোলা এবং পরবর্তী বিচ্ছেদকালেও ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবন কাহিনী যেকোনো ধ্রুপদী সিনেমার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।
আজকের ‘বাংলা রয়টার্স’ বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাইফ-অমৃতার সেই রাতজাগা প্রেম থেকে শুরু করে সন্তানদের আত্মপরিচয়ের সংকটের অমীমাংসিত অধ্যায়গুলো।
ঐতিহ্যের মিলবন্ধনে সাইফ ও অমৃতা
সাইফ আলী খান হলেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার মনসুর আলী খান পাতৌদি এবং অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের পুত্র। তিনি নওয়াবি ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যের ছোঁয়ায় বড় হয়েছেন। অন্যদিকে, অমৃতা সিংয়ের জন্মগত ইতিহাস ছিল আরও বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। অমৃতার মা ছিলেন মুসলিম এবং বাবা ছিলেন শিখ। অর্থাৎ দুই মেরুর ঐতিহ্যের মিশেলে বড় হওয়া অমৃতা স্বভাবতই একজন উদারপন্থী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাইফ এবং অমৃতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা ছিল কেবল ধর্ম নয়, বরং তাঁদের ১২ বছরের বয়সের ফারাক। সাইফ যখন বলিউডে কেরিয়ার শুরু করতে হিমশিম খাচ্ছেন, অমৃতা তখন ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ তারকা। কিন্তু বয়সের ব্যবধান বা সামাজিক বৈচিত্র্য তাঁদের হৃদয়ের আকর্ষণকে রুখতে পারেনি।
সেই কালজয়ী ডিনার: এক রাতেই পাল্টে গেল সব
১৯৯০-এর দশকের শুরুর কথা। চলচ্চিত্র নির্মাতা রাহুল রাওয়াইলের একটি সিনেমার সেটে প্রথম আলাপ হয়েছিল এই যুগলের। সাইফ প্রথম দেখাতেই অমৃতার প্রতি গভীর টান অনুভব করেন এবং অতি অল্প সময়ের পরিচয়েই অমৃতাকে তাঁর বাসভবনে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ জানান। অমৃতা সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছিলেন অত্যন্ত সংহত এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ আচরণ নিয়ে। কিন্তু সেই রাতের পরিবেশ তাঁদের এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পাল্টে যায় চিরতরে।
সাইফ পরবর্তীকালে এক ঘরোয়া সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, “ডিনার শেষে আবেগের আতিশয্যে আমরা একে অপরকে প্রথম চুম্বন করি। সেই মুহূর্তটি এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে আমি সেদিন আর অমৃতার ঘর ছেড়ে যেতে পারিনি। যদিও মার্যাদাবোধ থেকে আমি আলাদা একটি ঘরে রাত কাটাই, কিন্তু আমার অন্তর বলেছিল যে আমাদের জীবন এখন একই সুতোয় বাঁধা।” মজার ব্যাপার হলো, সেই ডিনারের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁরা অত্যন্ত সংগোপনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গোপনীয় বিবাহ এবং ‘আজিজা’ নাম গ্রহণ
সাইফ-অমৃতার বিয়ের সেই চমকপ্রদ তথ্য সম্প্রতি ফাঁস করেছেন বলিউডের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার জুটি আবু জনি ও সন্দ্বীপ খোশলা। তাঁরা ছিলেন এই প্রেমকাহিনীর নীরব সাক্ষী। সাইফ ও অমৃতার পরিবারের পূর্ণ সম্মতি ছিল না বিধায় তাঁরা এক বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্টে ত্বরিত বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন। ধর্মীয় মেলবন্ধন উদযাপনে সেই বিবাহস্থলে একই সঙ্গে একজন কাজি (মুসলিম ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ) এবং একজন শিখ পণ্ডিত উপস্থিত ছিলেন। নওয়াবি পরিবারে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে অমৃতা প্রথা মেনে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আজিজা’। যদিও তিনি প্রাত্যহিক জীবনে ‘অমৃতা সিং’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ডিজাইনার জুটি আবু ও সন্দ্বীপের বয়ান অনুযায়ী, দিনটি ছিল নাটকীয়তায় ঠাসা। কিছুটা উত্তেজনা, ভয় এবং প্রচুর ভালোবাসার মাঝে পাতৌদি পরিবারের নতুন বধূ হয়ে রাজকীয় সূচনায় পা দেন তিনি।
ধর্ম পালনে নেই জবরদস্তি: পতৌদির অনন্য শিক্ষা
বিবাহ পরবর্তী জীবনে সাইফ ও অমৃতার মধ্যে সবচাইতে বেশি চর্চার বিষয় ছিল ধর্ম। সমাজ হয়তো মনে করেছিল অমৃতাকে নওয়াব পরিবারের পুত্রবধূর প্রথা অনুসরণ করতে হবে, কিন্তু বাস্তব ছিল ভিন্ন। সাইফ আলী খান স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, তিনি কখনো তাঁর স্ত্রী অমৃতার ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর প্রভাব খাটাননি।
সাইফের ভাষায়, “আমি কখনোই অমৃতাকে (ডিঙ্গি— অমৃতার ডাকনাম) বাধ্য করিনি আমার ধর্ম গ্রহণ করার জন্য বা ইসলামি নিয়ম পালনের জন্য। পাতৌদি বাড়ির নীতিই হলো প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ বিশ্বাস ব্যক্তিগত থাকবে।” তাঁদের জীবনে সৌহার্দ্য এমন পর্যায়ে ছিল যে, যখন অমৃতা স্থানীয় গুরুদুয়ারায় প্রার্থনা করতে যেতেন, তখন সাইফ হাসিমুখে ঘরে সারা ও ইব্রাহিমের দায়িত্ব নিতেন। নওয়াবি ঐতিহ্যের সাথে শিখ ঐতিহ্যের এমন লালন বলিউডে এক বিরল নিদর্শন হয়ে রইল।
বিচ্ছেদকালীন শঙ্কা ও সন্তানদের প্রতি অগাধ আস্থা
২০০৪ সালে দীর্ঘ দাম্পত্যের অবসান ঘটে সাইফ এবং অমৃতার। বিচ্ছেদের এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটি দম্পতির মতো সাইফও ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্ৰস্ত। তবে সাইফের বড় আশঙ্কা ছিল সন্তানদের বড় হওয়া নিয়ে। সন্তানদের ধর্মীয় পরিচয়ে মা হিসেবে অমৃতা যেন কোনো সাম্প্রদায়িক ছাঁচ তৈরি না করেন, তা নিয়ে শুরুতে ভয় পেলেও পরবর্তীতে অমৃতাকে ধন্যবাদ জানান সাইফ। পাতৌদি রাজকুমার স্বীকার করেছেন যে, অমৃতার মাতৃত্বের মহত্ত্ব তাঁর প্রতি সাইফের আস্থা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। অমৃতার সাথে সন্তানদের বড় হওয়া সাইফ আলী খানের জীবনের বড় দুশ্চিন্তা নিরসন করেছিল। কারণ সাইফ নিশ্চিত ছিলেন যে, অমৃতা তাঁর সন্তানদের অন্তরে ইসলাম বা শিখ ধর্ম— কোনোটি নিয়েই ঘৃণা বা বিদ্বেষ রোপন করবেন না। সাইফ ও কারিনা কাপুরের বিবাহের প্রেক্ষাপটেও অমৃতা নিজের সন্তানদের পূর্ণ সুস্থ চিন্তায় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
“আমি কে?”: সারা আলী খানের শৈশব ও ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা
ভিন্ন ধর্মীয় আবহের মধ্যে বেড়ে ওঠার প্রভাব সচরাচর শিশু মনে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সময়ের পরিক্রমায় আজকের আবেদনময়ী নায়িকা সারা আলী খানও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। সারা আলী খান একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ছোটবেলায় বিদেশে ভ্রমণের সময় তিনি নিজের পরিবার নিয়ে অদ্ভুত সংকটে পড়তেন। বিশেষ করে পাসপোর্টে এবং নামের ক্ষেত্রে তিনি দেখতেন মায়ের নাম অমৃতা সিং, বাবার নাম সাইফ আলী খান, ভাই ইব্রাহিম আলী খান আর নিজের নাম সারা সুলতানা— এই সব বর্ণাঢ্য এবং ভিন্ন সংস্কৃতির নামের মিলবন্ধন দেখে কিশোরী সারার মনে প্রশ্ন জাগত, তিনি আসলে কার অংশ?
সারা সুলতানার প্রশ্নের উত্তরে অমৃতা সিংয়ের সেই প্রজ্ঞা সম্পন্ন বাক্যটি এখন আধুনিক ভারতের অসাম্প্রদায়িক চিন্তার একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কে?”— অমৃতা বলেছিলেন, “তুমি একজন ভারতীয়।” অমৃতা শেখাতে চেয়েছিলেন যে নাম বা ধর্ম গৌণ, সবার ওপরে আত্মপরিচয় হিসেবে মনুষ্যত্ব এবং জাতীয়তাই চূড়ান্ত সত্য।
সাইফ এবং অমৃতা সিংয়ের এই জীবনগাথা প্রমাণ করে যে সামাজিক বাঁধা বা ধর্মীয় অমিল কখনো ধ্বংসাত্মক হতে পারে না যদি সঙ্গী দুজনের মনে অগাধ শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। বর্তমানে সারা এবং ইব্রাহিম যেভাবে প্রতিটি উৎসবে— হোক তা ইদ, দীপাবলি বা বৈশাখী— স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন, তা আসলে মা-বাবা থেকে পাওয়া সেই উদার পারিবারিক শিক্ষার ফসল। ২০২৬ সালের আধুনিক পৃথিবীতে যখন পরিচয়বাদের রাজনীতি প্রখর হয়ে উঠেছে, তখন সাইফ-অমৃতার এই পুরনো কাহিনীর রেশ মানুষকে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। নওয়াবি প্রাসাদ আজ আর কেবল রাজপ্রাসাদ নেই, তা হয়ে উঠেছে সহাবস্থানের একটি কালজয়ী বিদ্যাপীঠ।
