তৃণমূল থেকে শুরু করে রাজধানী—বাংলাদেশের অর্থ প্রবাহের আধুনিক ধমনী হিসেবে পরিচিত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) বা মোবাইল ব্যাংকিং খাতটি বর্তমানে এক নজিরবিহীন স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি মাঠে অবৈধ অর্থের প্রভাব কমানো এবং ভোট কেনাবেচা রোধ করতে এক কঠোর ও বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার সময় ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাতের শূন্যস্থান স্পর্শ করল, ঠিক তখনই সারা দেশে সক্রিয় হওয়া এই নির্দেশনার আওতায় পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বাদে সব ধরণের লেনদেনে রাশ টানা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এই আদেশ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের মতো কোম্পানিগুলোর ওপর জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ব্যক্তিগত বা ‘পারসোনাল’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রচলিত অর্থ লেনদেন এখন খাদের কিনারে। মূলত ক্যাশ-ইন এবং ক্যাশ-আউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সেবাগুলো সম্পূর্ণ স্থগিত করার ফলে সাধারণ জনগণের যাপিত জীবনে যেমন বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তেমনি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন নির্বাচনি স্বচ্ছতার প্রবক্তারা।
ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট: পুরোপুরি নিথর এমএফএস এজেন্ট পয়েন্ট
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্বাচনিকালীন সময়ে নগদ টাকার অনাকাঙ্ক্ষিত লেনদেন ও বিতরণের মাধ্যমে নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার যে আশঙ্কা থাকে, তা প্রশমিত করতে এমএফএস একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখন অজপাড়াগাঁতেও সাধারণ ভোটারদের কাছে সেকেন্ডের মধ্যে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। একারণে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর মধ্যরাত পর্যন্ত কোনো পারসোনাল অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকানো (ক্যাশ-ইন) কিংবা নিকটস্থ এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলন (ক্যাশ-আউট) করা সম্ভব হবে না।
আজ সকালে ঢাকার মগবাজার, শান্তিনগর ও উত্তরের উত্তরা এলাকার বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, এজেন্টরা কোনো নতুন ক্যাশ-আউটের অনুরোধ গ্রহণ করতে পারছেন না। অনেকেই বিকাশ বা নগদ অ্যাপ খুললে দেখছেন এই অপশনগুলো ধোঁয়াশা হয়ে আছে কিংবা নিস্ক্রিয় রঙের আইকনে রূপান্তর হয়েছে। উত্তরার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল মোতালেব বাংলা রয়টার্সকে জানান, “ব্যবসার কাজের জন্য সবসময় ক্যাশ আউটের ওপর নির্ভর করতে হয়, এখন পকেটে টাকা না থাকায় বড় ঝামেলায় পড়েছি।”
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এটি স্থায়ী কোনো সংকট নয় বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার খাতিরে এবং একটি ‘নির্বাচনী অবরোধ’। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, অনেক রাজনৈতিক দল মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করেছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা অনেকটা নস্যাৎ হয়েছে।
‘সেন্ড মানি’ করার সক্ষমতা: তবে ১ হাজারে আটকে গেল সীমা
সম্পূর্ণ স্থবিরতা এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মানবিক পরিস্থিতি ও জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করে একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে টাকা পাঠানো বা ‘সেন্ড মানি’ সুবিধাটি আংশিকভাবে সচল রাখা হয়েছে। তবে এই লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যে লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছে তা রীতিমতো চমকপ্রদ। কোনো গ্রাহক একক লেনদেনে এক হাজার টাকার বেশি পাঠাতে পারবেন না। দিনে এই সুযোগটি মিলবে সর্বোচ্চ ১০ বার।
অর্থাৎ সারা দিনে ১০টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকার বেশি পাঠানো যাবে না। এই নিয়মটি চালুর ফলে দেখা যাচ্ছে, যারা বাড়ি ভাড়া প্রদান বা পাইকারি বাজার করার জন্য মোটা অংকের লেনদেনে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরা বিপাকে পড়েছেন। তবুও সাধারণ জনগণের অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জরুরি লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে ব্যাংক কর্মকর্তারা দাবি করছেন। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এক হাজার টাকা লেনদেনের সীমা রাখা হয়েছে মূলত এই কারণে যে—নির্বাচনি এলাকায় কর্মীদের দুপুরের খরচ কিংবা জরুরি কোনো প্রয়োজনে সাধারণ জনগণ যাতে একবারে হাতখালি হয়ে না পড়েন। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো প্রার্থীর পক্ষে লক্ষাধিক টাকার ফান্ড সরবরাহ করা আর সম্ভব হবে না।
যা কিছুই পাল্টায়নি: রিচার্জ, বিল পে ও পেমেন্ট সার্ভিস
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে একটি বিশেষ অংশ নাগরিকদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ও অপরিহার্য পরিষেবা যেন থমকে না যায়, সে লক্ষ্যে মোবাইল রিচার্জকে এই সীমার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আপনি চাইলে যত খুশি তত টাকার রিচার্জ যেকারো ফোনে পাঠাতে পারবেন। একইভাবে বর্তমান আধুনিক গৃহস্থালির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত প্রি-পেইড বিদ্যুৎ মিটার, গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ করার সুবিধাটিও আগের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন পরিশোধ বা জরুরি সরকারি ফির ক্ষেত্রেও কোনো নতুন নিয়মের গেরো দেওয়া হয়নি।
আরেকটি বড় সুবিধা সচল রাখা হয়েছে মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে। যদি কোনো গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে আগে থেকেই টাকা মজুদ থাকে, তবে তিনি বড় কোনো শোরুম, কাঁচাবাজার কিংবা অনলাইন ই-কমার্স পেমেন্টের ক্ষেত্রে টাকা খরচ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ক্যাশ-আউট নিষিদ্ধ থাকলেও ওয়ালেটের টাকা দিয়ে ডিজিটাল ইকোনমি বা কেনাকাটার পরিবেশকে প্রাণবন্ত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবাহ থামাতে চায়নি, বরং কাগজি মুদ্রায় রূপান্তর হওয়ার বা নগদ অর্থ বিতরণের পথটিই কেবল রুদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞ মহলের ভিন্নমত ও প্রতিক্রিয়ার ঢেউ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী সিদ্ধান্তে ভিন্ন ধরণের মেরুকরণ দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী যারা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য পুরোপুরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের সাময়িক উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় এমএফএস এজেন্টরাই এক ধরণের ‘লিঙ্ক ব্যাংক’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে গত রাতে টাকার আদান-প্রদান থমকে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সচলতা কিঞ্চিৎ হ্রাস পেয়েছে।
বিআইবিএম-এর একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা রয়টার্সকে বলেন, “এটি নির্বাচনি সংস্কৃতির জন্য ভালো কিন্তু ব্যবসার জন্য প্রতিকূল। এক হাজার টাকার সীমা নির্ধারণ করা কিছুটা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একে রুখতে এই ধরণের কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ছিল না।”
এদিকে শীর্ষ দুই এমএফএস জায়ান্ট বিকাশ ও নগদ তাঁদের গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বিশেষ মেসেজ পাঠিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটা বা নির্বাচনের দিন পেরিয়ে যখন বৃহস্পতিবার আসবে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে অ্যাপের ইন্টারফেস বা এজেন্ট পোর্টালে আগের নিয়ম বহাল হয়ে যাবে। তারা তাঁদের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নির্দেশ দিয়েছে যাতে সিস্টেম এই ৯৬ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন থাকে এবং অনুমোদিত সেবাগুলো যেন অন্তত বিঘ্নিত না হয়।
নির্বাচনের নিরাপত্তায় এমএফএস একটি ট্রয়ান হর্স?
অতীতের একাধিক স্থানীয় ও উপ-নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা গোয়েন্দারা দেখেছেন যে, প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে দুর্নীতির প্রসার ঘটা সহজতর হয়েছে। ভোট গ্রহণের আগের রাতে গ্রামগঞ্জের ভোট ব্যাংক ম্যানেজ করতে বিপুল অংকের টাকার সমাগম এমএফএসের মাধ্যমেই ঘটত বলে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এমএফএসের ক্যাশ-ইন রুদ্ধ করার ফলে শহরের টাকা এখন আর চাইলেই নির্বাচনি ডামাডোলের ভেতর পকেটবন্দী করে গ্রামে পাঠানো যাবে না। ফলে ভোটারদের প্রভাবিত করার ‘সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল টুলসটি’ বর্তমানে অকার্যকর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন, “আমরা দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেম বা মানুষের আস্থার জায়গা নষ্ট করতে চাইছি না। আমাদের মূল লক্ষ্য টাকার ট্র্যাকিং ও অসামাজিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ গ্রাহকের জমা থাকা টাকা নিরাপদ আছে। তাঁরা বিল দিতে পারছেন, সেবা গ্রহণ করছেন। কেবল টাকার উৎস ও রূপান্তরটা নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে দেশের গণতন্ত্র ও ভোটের মর্যদা অক্ষুণ্ণ রাখতে।”
নিরাপদভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোতায়েন ছাড়াও এই ডিজিটাল ব্যারিকেড বর্তমানে একটি সফল প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদী নীতিনির্ধারক মহল। জনগণের ভোগান্তি চরমে যেন না পৌঁছায়, সেকারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে লেনদেন সীমা পুনরায় পর্যালোচনা করে কিছুটা বর্ধিত করার পরিকল্পনাও করছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
এই ৯৬ ঘণ্টা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষা। ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত জনগণের এই ছোট ত্যাগের বিনিময়ে অন্তত একটি টাকার খেলার মুক্ত নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন দেশবাসী। বাংলা রয়টার্স সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী প্রতিটি নির্দেশনার বিস্তারিত বিবরণ প্রচারের জন্য সচেষ্ট রয়েছে।
