পতেঙ্গা সৈকতে তারুণ্যের সুরে আমীর খসরু

পতেঙ্গা সৈকতে তারুণ্যের সুরে আমীর খসরু

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর পতেঙ্গা সৈকতের নোনা বাতাসে গতকাল বিকেলে এক ভিন্নধর্মী দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রথাগত রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চ ছেড়ে একদল তরুণের সাথে গিটারের সুরে গলা মেলালেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের এই হেভিওয়েট প্রার্থী বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরের ইপিজেড আকমল আলী রোডের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সমুদ্রসৈকতে ‘ইয়ুথ টক’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। সেখানে রাজনীতির গাম্ভীর্য ছাপিয়ে প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সংস্কৃতি এবং আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন প্রজন্মের ভাবনা।

অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং নেটিজেনদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পতেঙ্গা সৈকতের পাড়ে বসে একদল তরুণ গিটার বাজাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে একজন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান ‘কইলজ্যার ভিতর গাতি রাইখখুম তোঁয়ারে’ (কলিজার ভেতর গেঁথে রাখব তোমাকে) গাইছিলেন। গানের কথাগুলো যখন সুরের মূর্ছনায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। স্মিতহাস্যে তরুণের সাথে তাল মিলিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় গেয়ে ওঠেন— ‘কইলজ্যার ভিতর গাতি রাইখখুম তোঁয়ারে, সিনার লগে বাঁধি রাইখখুম তোঁয়ারে, অ ননাইরে।’

একজন জ্যেষ্ঠ জাতীয় নেতার এমন সহজ-সরল ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা উপস্থিত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় প্রেমের এই গানটি কেবল বিনোদন নয়, বরং সাধারণ মানুষের সাথে প্রার্থীর এক গভীর সংযোগের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গানের পর অনুষ্ঠিত ‘ইয়ুথ টক’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তরুণদের গুরুত্ব নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা প্রায়ই বলি তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু কেবল মুখে বললেই হবে না, তাঁদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি তাঁদের মনের কথা না শুনি, তাঁদের আকাঙ্ক্ষাগুলো না বুঝি, তবে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের জানতে হবে তরুণরা দেশ নিয়ে কী ভাবছে, তাদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও বাক-স্বাধীনতার চাহিদাগুলো কী কী।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আজকের এই আয়োজন থেকে আমি নিজেও অনেক কিছু শিখে গেলাম। দেশ গড়তে হলে কেবল ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে হবে না, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে সবার কথা শোনার এবং বোঝার পরিবেশ থাকবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-১১ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে এটি আমীর খসরুর একটি কৌশলী ও আধুনিক প্রচারণার অংশ। বন্দর-পতেঙ্গা এলাকাটি মূলত শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এবং এখানকার ভোটারদের একটি বড় অংশই তরুণ। প্রথাগত জনসভার পরিবর্তে সৈকতের খোলা বাতাসে তরুণদের সাথে বসে চা পান করা কিংবা গান গাওয়া ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ‘এক্সেসিবিলিটি’ বা সহজলভ্যতা প্রমাণ করে।

অনুষ্ঠানে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু, চট্টগ্রাম নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনজুর আলম, সদস্য সরফরাজ কাদের, বিএনপি নেতা মো. আশরাফ এবং চিকিৎসক ফারহানাজ মাবুদ। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাজীবী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী এই মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরা পরিবেশ বিপর্যয়, সৈকত এলাকার টেকসই উন্নয়ন এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা প্রার্থীর সামনে তুলে ধরেন।

আলোচনার এক পর্যায়ে আকমল আলী রোডের বেড়িবাঁধ এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়। স্থানীয় তরুণরা জানান, পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে এই সুন্দর সৈকত এলাকাটি অবহেলিত। আমীর খসরু আশ্বাস দেন যে, নির্বাচিত হলে তিনি পতেঙ্গা ও বন্দর এলাকার উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন।

গানের ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক হাজার শেয়ার ও মন্তব্য জমা পড়ে। অনেক তরুণ মন্তব্য করেছেন যে, প্রথাগত রাজনীতির গুমোট পরিবেশের বাইরে এমন সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া রাজনীতিকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাবে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন স্থানীয় মানুষের মনে প্রার্থীর প্রতি বাড়তি আবেগ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সবসময়ই একজন মার্জিত ও আধুনিক মনস্ক নেতা হিসেবে পরিচিত। গতকালের এই ‘ইয়ুথ টক’ অনুষ্ঠানটি আবারও প্রমাণ করল যে, ভোটের রাজনীতির বাইরেও সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো সম্ভব। পতেঙ্গার নোনা জল আর গিটারের সুরে যে সংহতির বার্তা তিনি দিলেন, তা আগামীর নির্বাচনী ময়দানে তাঁর জন্য কতটা ইতিবাচক ফল বয়ে আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কণ্ঠ মিলিয়ে তিনি চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন— যা রাজনৈতিক প্রচারণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন