বাংলাদেশের নির্বাচনের পরই পাক-ভারত ম্যাচ নিয়ে ‘ইউ-টার্ন’ নেবে পাকিস্তান

বাংলাদেশের নির্বাচনের পরই পাক-ভারত ম্যাচ নিয়ে ‘ইউ-টার্ন’ নেবে পাকিস্তান

বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই নিয়ে যখন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই এক বিস্ফোরক দাবি নিয়ে হাজির হলেন ভারতের সাবেক পেসার ও সাবেক প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মা। তাঁর মতে, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা স্রেফ একটি রাজনৈতিক কৌশল এবং সাময়িক নাটক। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ‘ইউ-টার্ন’ নেবে বলে মনে করছেন তিনি।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোর ঐতিহ্যবাহী আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির আঁচ লেগেছে ক্রিকেট মাঠেও। সম্প্রতি নিরাপত্তাশঙ্কার অজুহাতে আইসিসি বাংলাদেশ থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাংলাদেশকে মূল টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে। আইসিসির এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছে যে, তারা এই বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ খেলবে না।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় চেতন শর্মা এই জটিল পরিস্থিতির ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, পুরো বিষয়টির মূলে রয়েছে রাজনীতি, ক্রিকেট নয়। চেতন শর্মা বলেন, “এখানে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আসলে কোনো দোষ নেই। এটি স্রেফ একটি ভূ-রাজনৈতিক চাল। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই তারিখটি পার হওয়ার পরেই দেখবেন পাকিস্তান তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে।”

৬০ বছর বয়সী এই সাবেক ক্রিকেটার আরও যোগ করেন, “নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার সম্ভবত জনমতের দোহাই দিয়ে বলবে যে, ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ের কথা চিন্তা করে এবং খেলাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করতে তারা ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধানও এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং খেলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানাতে পারেন।”

চেতন শর্মা মনে করেন, পাকিস্তান সরকারের এমন অনমনীয় অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খোদ পাকিস্তানের ক্রিকেটাররাই। তিনি বলেন, “পিসিবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে ম্যাচ বয়কটের বিষয়ে কোনো লিখিত চিঠি দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পোস্ট বা ঘরোয়া মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের কোনো আইনি ভিত্তি আইসিসির কাছে নেই। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এসব কথার কোনো মূল্য নেই। মাঝখান থেকে পাকিস্তানের প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা মানসিক চাপে পড়ছেন এবং ক্রিকেটের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।”

উল্লেখ্য, গত ১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এক বার্তায় বলা হয়েছিল যে, পাকিস্তান ক্রিকেট দল ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে ঠিকই, কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারির হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হবে না। গত বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও একই সুর মিলিয়ে বলেন, “খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়, তাই আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলব না।” তবে বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে স্ববিরোধিতা খুঁজে পাচ্ছেন, কারণ একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে (বাংলাদেশ ইস্যু) ম্যাচ বয়কট করা নিজেই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

চেতন শর্মা কেবল একজন ক্রিকেটারই নন, তিনি ভারতের রাজনীতির অলিগলি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা রাখেন। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি। ভারতের হয়ে ২৩ টেস্ট ও ৬৫ ওয়ানডে খেলা এই পেসার খেলোয়াড়ি জীবন শেষে রাজনীতিতে নাম লেখান। ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং দলটির ক্রীড়া সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে এমন কট্টর অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর একটি পুরনো কৌশল।

ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকেট ইতিমধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় পাকিস্তান সত্যিই বয়কটের সিদ্ধান্তে অটল থাকে কি না, নাকি চেতন শর্মার দাবি অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারির পর সুর পাল্টায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব ক্রিকেট।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি বয়কট করে, তবে আইসিসির কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে পিসিবিকে। এমনকি ভবিষ্যতে বড় কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনের অধিকারও হারাতে পারে তারা। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর এখন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং ক্রিকেটের ভাগ্যও ঝুলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন