বাঁশখালী এর জনপদে র‌্যাবের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান

বাঁশখালীর জনপদে র‌্যাবের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান: বস্তাভর্তি আগ্নেয়াস্ত্র ও রামদা উদ্ধার, সটকে পড়ল দুর্বৃত্তরা

চট্টগ্রামের উপকূলীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত বাঁশখালী উপজেলায় গভীর রাতে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৭)। সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে উপজেলার সরল এলাকায় এই সফল অভিযান পরিচালিত হয়। মূলত আসন্ন দিনগুলোতে কোনো বড় ধরণের সহিংসতা বা নাশকতামূলক পরিকল্পনা নস্যাৎ করতেই র‍্যাবের এই অতর্কিত অভিযান বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে আধুনিক বিদেশি পিস্তল থেকে শুরু করে ভারি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী হামলায় ব্যবহৃত ধারালো রামদা।

সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে পরিচালিত এই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিপুল গোলাবারুদ জব্দ করতে সক্ষম হলেও দুর্বৃত্তদের কাউকেই হাতে-নাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সটকে পড়া অপরাধী চক্রকে গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ব্লক রেইড বা সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব-৭-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল সোমবার রাত বারোটার পর বাঁশখালীর সরল এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসছিল যে, বাঁশখালীর নির্জন এবং গাছগাছালিতে ঘেরা সরল এলাকায় কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নতুন করে আস্তানা গড়ার চেষ্টা করছে এবং সেখানে ভারী সমরাস্ত্র মজুদ করা হয়েছে। রাতের নিস্তব্ধতা কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা যেন তাদের অস্ত্র সরবরাহ করতে না পারে, সেজন্য র‍্যাব চারদিক থেকে এলাকাটিকে ঘিরে ফেলে।

সরল এলাকার একটি নির্দিষ্ট স্থান লক্ষ্য করে অভিযান এগিয়ে নিতেই র‌্যাবের প্রশিক্ষিত দলের উপস্থিতি আঁচ করতে পারে সেখানে অবস্থানরত দুর্বৃত্তরা। আধারে পাহাড়ি পথ এবং জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র চক্রটি পালানোর সময় পেছনে দুটি ভারী প্লাস্টিকের বস্তা ফেলে যায়। র‌্যাব সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে ধাওয়া করেও অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পলায়ন করা অপরাধীদের ধরতে সক্ষম না হলেও পরিত্যক্ত ওই বস্তা দুটি খুলে চমকে ওঠেন। তারা দেখেন যে, অত্যন্ত সুচারুভাবে ওই দুটি বস্তার ভেতর আধুনিক অস্ত্র এবং গোলাবারুদ প্যাক করে রাখা হয়েছিল।

জব্দকৃত অস্ত্রের তালিকা

অভিযান শেষে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের চূড়ান্ত যে খতিয়ান র‌্যাব প্রকাশ করেছে, তা স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য রীতিমতো আতঙ্কজনক। জব্দকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে:
১. একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল (অটোমেটিক অপারেশন সমর্থিত)।
২. পিস্তলে ব্যবহৃত চার রাউন্ড তাজা গুলি।
৩. দুটি সচল একনলা বন্দুক (এলজি), যা দূর থেকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
৪. একনলা বন্দুক ও রাইফেলের উপযোগী মোট ১৪টি শক্তিশালী কার্তুজ।
৫. চারটি বিশাল আকারের লোহার তৈরি নতুন ও ধারালো রামদা।

র‍্যাবের অপারেশনাল কর্মকর্তাদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র ইঙ্গিত দেয় যে ওই এলাকায় নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরণের কোনো সংঘর্ষ কিংবা বড় ধরণের ডাকাতির পরিকল্পনা চলছিল। বিশেষ করে রামদাগুলোর ধারালো প্রান্ত নির্দেশ করছে যে অপরাধীরা অত্যন্ত বীভৎস কোনো ঘটনার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিল।

অস্ত্র উদ্ধারের এই সাফল্যের বিষয়ে চট্টগ্রামের র‍্যাব-৭-এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন বাংলা রয়টার্স-কে বলেন, “বাঁশখালীর দুর্গম এলাকাগুলোকে অপরাধমুক্ত রাখা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। সোমবার মধ্যরাতে চালানো অভিযানে অপরাধীরা পালিয়ে গেলেও তারা তাদের মারণাস্ত্রগুলো ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে। জব্দকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের জন্য এবং ডাম্পিং প্রসিডিউর শেষে বাঁশখালী মডেল থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, যদিও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অস্ত্র আইনে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার রুট ম্যাপ তৈরি করে আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ শুরু করেছেন এবং এই অস্ত্র সরবরাহের শেকড় কতদূর তা দ্রুতই উন্মোচিত হবে। এলাকায় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে র‍্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত টহল কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরবর্তী হওয়ার কারণে এবং ভৌগোলিকভাবে সমুদ্রতট ও অনুচ্চ পাহাড়ের কোলঘেঁষা হওয়ায় বাঁশখালী বরাবরই সন্ত্রাসীদের এবং জলদস্যুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইতিপূর্বে এখানে লবণের মাঠ কিংবা চিংড়ির ঘের দখলকে কেন্দ্র করে প্রচুর সংঘর্ষ ও অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দেখার নজির রয়েছে। সরলের মতো দুর্গম জায়গাগুলো অনেক সময় বড় অপরাধীদের হাইডআউট বা আস্তানা হিসেবে গড়ে ওঠে।

র‍্যাবের এই অভিযানের পর সরলসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রাম— গন্ডামারা, শেখেরখীল ও সাধনপুর এলাকায় স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গ্রামবাসী জানান, গভীর রাতে যখন সরকারি গাড়ির আলো আর বুটের আওয়াজ পাচ্ছিলেন তারা, তখনই আন্দাজ করেছিলেন বড় কিছু হতে চলেছে। গ্রামবাসীর ধারণা, বাইরের কোনো চক্র এলাকায় বড় ধরণের নাশকতার জন্য অস্ত্রগুলো এখানে ডাম্পিং করেছিল।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে উপকূলীয় জেলাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাঁশখালীর মতো এলাকায় নিয়মিত অস্ত্রের চালান ধরা পড়লে সেটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভাবিয়ে তোলে। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল জব্দ করা বা বস্তা উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয় বরং এই বিদেশি পিস্তলটির উৎস কোথায় এবং কাদের মাধ্যমে এগুলো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সরল এলাকায় এল তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। এই অস্ত্র সরবরাহে কোনো স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কিনা সেটিও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসন্ন বড় সামাজিক অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় উন্নয়ন কাজগুলোকে নির্বিঘ্ন করতে সব ধরণের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ধরণের অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের খবর পাওয়া গেলে কোনো বিশেষ পরিচয় তোয়াক্কা না করেই অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশ ও বিজিবি-কে।

অভিযানে সফল হওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে পুরো সরল এলাকা জুড়ে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়েছে যেন আরও কোথাও গোপন মাটির তলে বা ড্রামের ভেতর অস্ত্র লুকানো রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা যায়। গোয়েন্দারা সন্দেহভাজন কয়েকজন সাবেক দাগী অপরাধীর তালিকা করে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ টহল টিম।

সরল থেকে বাঁশখালী সদর যাওয়ার প্রধান সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন করে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, যেহেতু অস্ত্রের বিশাল বহর ছিল, সেহেতু সন্ত্রাসীরা এলাকায় আরও কিছু গোলাবারুদ সরিয়ে নিয়েছে। সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

র‍্যাব-৭ এর এই মধ্যরাতের সাহসী পদক্ষেপ অপরাধীদের মনে এক ধরণের ভীতি সঞ্চার করেছে। তবে বাঁশখালীবাসীর দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে কেবল অভিযান নয় বরং জনগণের সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে তথ্য দিয়ে বাহিনীকে সহায়তা করার বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষ চায় অবৈধ অস্ত্রের মহড়া বন্ধ হয়ে আবারও এই প্রাকৃতিক জনপদে শান্তি ফিরুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন