লর্ড ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি: গভীর সংকটে কিয়ার স্টারমারের সরকার

লর্ড ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি: গভীর সংকটে কিয়ার স্টারমারের সরকার, নিজ দলের অভ্যন্তরেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি

ব্রিটেনের বর্তমান লেবার সরকারের অন্দরে চরম বিশৃঙ্খলা এবং নজিরবিহীন নেতৃত্ব সংকটে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া একটি পুরনো বিতর্ক নতুন করে প্রাণ পাওয়ায় খোদ লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতারাই এখন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে শুরু করেছেন। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট’-এর দুই শীর্ষ ও ক্ষমতাধর কর্মকর্তার পদত্যাগের ফলে এই সংকট এখন রাজপথ ছাড়িয়ে হোয়াইট হলের অলিতে-গলিতে সংক্রামিত হয়েছে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট-উত্তর ব্রিটিশ রাজনীতিতে এর আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রীকে নিজের মন্ত্রিসভা এবং তৃণমূলের কাছে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা যায়নি।

সংকটের কেন্দ্রে ‘লর্ড ম্যান্ডেলসন বিতর্ক’

ঘটনার মূলে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং সাবেক লেবার সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন। বিতর্কিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সাথে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আগে থেকেই জনমনে অসন্তোষ ছিল। তবে কিয়ার স্টারমার ২০২৪ সালের শেষের দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার অজুহাতে এই বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকেই ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। সেই সময় এই নিয়োগকে ‘একটি ভুল এবং নীতিহীন’ পদক্ষেপ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ার করেছিলেন।

পরবর্তীতে জনরোষ এবং গোয়েন্দা তথ্যের চাপে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্টারমার লর্ড ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত পদ থেকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন। কিন্তু বরখাস্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর সরকারি সুবিধাপ্রাপ্তি এবং জেফরি এপস্টিনের সাথে ল্যান্ড রোভার এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে তাঁর যাতায়াতের নথিপত্র একের পর এক ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডে ফাঁস হতে থাকে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে গত সপ্তাহে ম্যান্ডেলসন বাধ্য হয়ে লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন এবং ‘হাউস অব লর্ডস’-এ তাঁর প্রতিনিধিত্ব থেকেও ইস্তফা দেন।

ডাউনিং স্ট্রিটে শীর্ষ পর্যায়ের মহাপ্রস্থান

প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই ঝটিকায় আরও অসহায় বোধ করতে শুরু করেছেন তাঁর দুই প্রধান রাজনৈতিক মস্তিকের প্রস্থান নিয়ে। গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত প্রভাবশালী চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। লর্ড ম্যান্ডেলসনকে বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়ার পেছনের মূল পরামর্শদাতা হিসেবে ম্যাকসুইনিকেই দায়ী করা হচ্ছে।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগ প্রধান টিম অ্যালান। ম্যান্ডেলসন ইস্যুতে জনমত সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাওয়া এবং গণমাধ্যমের কড়া সমালোচনার চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েই অ্যালান সরে দাঁড়িয়েছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে। শীর্ষস্থানীয় এই দুই থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক পদত্যাগ করায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এখন কার্যত প্রশাসনিকভাবে একা হয়ে পড়েছেন। লর্ড ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার যে ভুল নৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন, এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার সরে দাঁড়ানোকে তার দায়ভার গ্রহণ হিসেবেই দেখছে সচেতন মহল।

আনাস সারোয়ারের বোমা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ

তবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সবচাইতে বড় আঘাতটি এসেছে উত্তরের রাজ্য স্কটল্যান্ড থেকে। স্কটিশ লেবার পার্টির প্রধান নেতা আনাস সারোয়ার সোমবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। সচরাচর লেবার পার্টির হাই কমান্ডের প্রতি আনাস সারোয়ার আনুগত্য পোষণ করলেও এবার তিনি জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।

আনাস সারোয়ার বলেন, “বর্তমান লেবার সরকার জনগণের কল্যাণে অনেকগুলো মহৎ কাজ হাতে নিয়েছে, কিন্তু ম্যান্ডেলসন ও এপস্টিনের কেলেঙ্কারির কালোরঙের ছায়ায় সেই সব ইতিবাচক কাজ আজ ম্লান হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এখন সরকারের সাফল্য শুনতে পারছে না বরং সরকারের নীতিহীনতা নিয়ে বেশি আলোচনা করছে। এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি দেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা মনে করি ডাউনিং স্ট্রিটের বর্তমান নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন দরকার। এই সংকটের দায় প্রধানমন্ত্রীকে এড়ানো সম্ভব নয়।”

স্কটিশ নেতার এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লেবার পার্টির অন্দরে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে অনাস্থার পরিবেশ দ্রুত ঘনঘটা হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থান এবং মন্ত্রিসভার সমর্থন

বিরূপ পরিস্থিতিতে পিছু হটতে রাজি নন কিয়ার স্টারমার। ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার সভায় তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, দেশ পরিবর্তন এবং জনসেবার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন তা থেকে তিনি বিচ্যুত হবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে, পদত্যাগের কোনো অভিপ্রায় বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেই। স্টারমার বিশ্বাস করেন, কঠিন সময় আসবে কিন্তু সরকারকে অবিচল থেকে পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে হবে।

নিজ দলের অভ্যন্তরে বড় ধরণের বিদ্রোহ চললেও স্টারমারের উদ্ধারকর্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছেন তাঁর মন্ত্রিসভার শক্তিশালী স্তম্ভগুলো। ব্রিটেনের প্রথম নারী চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রম্পটে উল্লেখিত উপপ্রধানমন্ত্রী ও সম্ভাব্য বিদেশমন্ত্রী প্রেক্ষাপটে) ডেভিড ল্যামি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। মন্ত্রিসভার জনপ্রিয় সদস্য এবং লেবার পার্টির ডেপুটি লিডার অ্যাঞ্জেলা রেনার সবাইকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “সাময়িক অস্থিরতাকে বড় করে দেখলে বিরোধীদের স্বার্থ উদ্ধার হবে। আমাদের কিয়ারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত।”

বিরোধী দল এবং পুনরায় নির্বাচনের ছায়া

সরকারের এই টালমাটাল অবস্থায় উল্লসিত ব্রিটিশ বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি বা ‘টরীরা’। দলটির প্রধান নেতা কেমি ব্যাডেনক সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে স্টারমার প্রশাসন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি ব্যাখা করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার জেফরি এপস্টিনের সহচরের পাশে দাঁড়িয়ে যে ঐতিহাসিক কলঙ্ক সৃষ্টি করেছেন তা ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ব্যবস্থার ঐতিহ্যকে অপমানিত করেছে। ব্যাডেনক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যদি পদত্যাগ না করেন তবে সরকারকে আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রয়োজনে আবারও নির্বাচনের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণের জনমত যাচাই করা উচিত।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তোলপাড়

সংকটের অবসান ঘটাতে মঙ্গলবার বিকেলে হাউজ অফ কমন্সে অর্থাৎ পার্লামেন্টে একটি দীর্ঘ ভাষণ দিতে পারেন কিয়ার স্টারমার। সেখানে তিনি লর্ড ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্তের পর যে বড় অঙ্কের আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস (পররাষ্ট্র দপ্তর) এক জরুরি তদন্ত শুরু করেছে। সেই অর্থ জনকল্যাণ তহবিলে ফেরত আনার প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে স্টারমার প্রশাসন।

জেফরি এপস্টিন নামটির সাথে যুক্ত হওয়ার যেকোনো কলঙ্ক পশ্চিমা রাজনীতিতে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো কাজ করে। সেই লাভার রেশ এবার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। লর্ড ম্যান্ডেলসনের অপকীর্তি কি কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরও ইতি ঘটাবে নাকি এই ঝড়ের শেষে স্টারমার আবারও তাঁর নেতৃত্ব ফিরে পাবেন—তা কেবল পার্লামেন্টের আগামী ৪৮ ঘণ্টার কার্যকলাপই বলে দেবে।

ব্রিটিশ আমজনতা এবং বিশেষ করে লেবার সমর্থকরা এখন সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রধানমন্ত্রীর মঙ্গলবারের সেই ভাষণের ওপর। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং ঘনিষ্ঠ মার্কিন দূতাবাসও নিবিড়ভাবে নজরে রাখছে টেমস নদীর ধারের এই তীব্র নাটকীয় পটপরিবর্তনকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন