গ্রোক দিয়ে আর বানানো যাবে না অশালীন ‘ডিপফেক’ ছবি

গ্রোক দিয়ে আর বানানো যাবে না অশালীন ‘ডিপফেক’ ছবি

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’ (Grok)-এর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা, আইনি জটিলতা এবং নৈতিক উদ্বেগের মুখে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা করেছে যে, গ্রোক এখন থেকে বাস্তব কোনো মানুষের ছবি সম্পাদনা করে অশালীন বা উন্মুক্ত পোশাকে প্রদর্শন করতে পারবে না। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কথা নিশ্চিত করেছে।

ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’ (xAI) যখন গ্রোক চ্যাটবটটি বাজারে আনে, তখন থেকেই এটি এর ‘মুক্ত ও খোলামেলা’ আচরণের জন্য আলোচিত ছিল। তবে সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে যে, ব্যবহারকারীরা গ্রোক ব্যবহার করে বিভিন্ন তারকা এবং সাধারণ মানুষের ছবি বিকৃত করে অশালীন ‘ডিপফেক’ (Deepfake) ছবি তৈরি করছেন। বিশেষ করে অনুমতি ছাড়াই বাস্তব মানুষের ছবিকে বিকিনি, অন্তর্বাস বা অনুরূপ উন্মুক্ত পোশাকে রূপান্তরের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এমনকি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের ছবিও বিকৃত করার অভিযোগ ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

এক্স তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, বাস্তব মানুষের ছবি সম্পাদনার ক্ষেত্রে গ্রোকের সক্ষমতা এখন থেকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কোনো বাস্তব মানুষের ছবিকে অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ অবস্থায় দেখানোর সুযোগ প্রযুক্তিগতভাবেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা প্ল্যাটফর্মের সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম বা অর্থ প্রদানকারী গ্রাহক—সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

এক্স-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা এবং স্থানীয় আইন মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্রোকের অপব্যবহার করে কেউ যেন আইন লঙ্ঘন করতে না পারে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

গ্রোকের এই বিতর্কিত ফিচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য। ক্যালিফোর্নিয়ার শীর্ষ কৌঁসুলি বা অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, গ্রোকের মাধ্যমে তৈরি যৌন উত্তেজক ডিপফেক ছবি এবং শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি তারা গভীরভাবে তদন্ত করছেন। এই আইনি তদন্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক্স তাদের পিছু হটার ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সরকারও এই বিষয়ে সোচ্চার ছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এআই টুলের মাধ্যমে ভুল তথ্য এবং কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া নিয়ে এক্স-কে সতর্ক করেছিলেন। গ্রোকের ওপর এই নতুন বিধিনিষেধের পর যুক্তরাজ্য সরকার একে তাদের অবস্থানের ‘যৌক্তিকতা’ হিসেবে দেখছে। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফকম’ (Ofcom) জানিয়েছে, এক্স-এর এই পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও তারা এখনো খতিয়ে দেখছে যে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্যের অনলাইন নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না।

এশিয়া মহাদেশেও গ্রোকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ দেখা গেছে। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি গ্রোকের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল। এই দেশগুলোর মতে, এআই-এর এমন অপব্যবহার ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

এক্স জানিয়েছে, যেসব দেশে এ ধরনের এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট বা ডিপফেক ছবি তৈরি সম্পূর্ণ অবৈধ, সেখানে ‘জিওব্লকিং’ (Geoblocking) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, ওই দেশগুলোর ভৌগোলিক সীমানার ভেতর থেকে গ্রোক ব্যবহার করে এমন কোনো ছবি আর তৈরি করা সম্ভব হবে না। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় আইনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

শুরুতে ইলন মাস্ক গ্রোকের ওপর সেন্সরশিপ আরোপের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি সমালোচকদের বাকস্বাধীনতা দমনকারী হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন। এমনকি তিনি নিজে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর একটি এআই-তৈরি ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করে বিতর্কের ঘি ঢেলেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনিও সুর নরম করেছেন।

মাস্ক জানিয়েছেন, বাস্তব মানুষের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কল্পিত বা কাল্পনিক কোনো চরিত্রের ক্ষেত্রে গ্রোকের কিছু সৃজনশীল স্বাধীনতা থাকবে। তিনি একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর-রেটেড’ (R-rated) সিনেমার সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি চলচ্চিত্রে যেমন দৃশ্য দেখা যায়, গ্রোকের কাল্পনিক কনটেন্টও সেই মানদণ্ড অনুসরণ করবে। তবে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই বাস্তব কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-এর অপব্যবহার রোধে এক্স-এর এই সিদ্ধান্ত একটি মাইলফলক হতে পারে। তবে তারা মনে করেন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। ডিপফেক বা এআই-তৈরি পর্নোগ্রাফি বর্তমানে ইন্টারনেটের অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। অনুমতি ছাড়া অন্যের শরীর বা মুখমণ্ডল ব্যবহার করে অশালীন ছবি তৈরি করা মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই টুলগুলো যাতে অপরাধীদের হাতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্ত আইন প্রণয়ন এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এক্স-এর এই পিছু হটা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির অবাধ স্বাধীনতার চেয়ে জননিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইলন মাস্কের ‘এক্স’ এবং তাদের এআই ‘গ্রোক’ নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তার এই সমাধান ডিজিটাল যুগের একটি নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাহীন ক্ষমতার সাথে যে বিশাল দায়বদ্ধতা জড়িয়ে থাকে, তা এখন বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। বিশ্ববাসীর চাপের মুখে গ্রোকের এই পরিবর্তন কেবল একটি কারিগরি আপডেট নয়, বরং এটি অনলাইন সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার এক বড় বিজয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন