আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ অঙ্গ হলো যকৃৎ বা লিভার। শরীরের বিপাক ক্রিয়া থেকে শুরু করে বিষমুক্তকরণ—সবই সম্পন্ন হয় এই অঙ্গের মাধ্যমে। তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লিভারের একটি সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা হলো ‘ফ্যাটি লিভার’। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, কেবল স্থূলকায় বা ওজস্বী মানুষেরাই এই রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে রোগা বা ছিপছিপে চেহারার মানুষের লিভারেও চর্বি জমতে পারে। সম্প্রতি গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট এবং লিভার বিশেষজ্ঞরা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন।
ফ্যাটি লিভার কী এবং কেন হয়?
লিভারের কোষে যখন অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট জমা হয়, তখন সেই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজ়িজ়’ (MASLD) বলা হয়। পূর্বে একে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজ়িজ়’ (NAFLD) বলা হতো। আমেরিকান লিভার ফাউন্ডেশনের মতে, এই রোগ মদ্যপানের কারণে হয় না; বরং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব এর প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি বা লিপিড প্রোফাইল অস্বাভাবিক হওয়া, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পেটে অতিরিক্ত মেদ এবং অতিরিক্ত রিফাইন্ড শর্করা বা চিনি গ্রহণ এই রোগের অন্যতম অনুঘটক। এছাড়া বংশগত বা জেনেটিক কারণেও কেউ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন।
রোগা মানুষের ঝুঁকি কেন?
বিখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরীর মতে, ফ্যাটি লিভার মূলত ‘সুখীদের অসুখ’। কায়িক পরিশ্রম যত কমবে, এই রোগের ঝুঁকি তত বাড়বে। অনেকে মনে করেন, আমার শরীরে তো মেদ নেই, আমি কেন আক্রান্ত হবো? চিকিৎসকদের মতে, রোগা মানুষের শরীরের এমন কিছু অভ্যন্তরীণ অংশে মেদ জমে থাকে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। একে ‘একটোপিক ফ্যাট’ বলা হয়। অর্থাৎ লিভারের কোষে চর্বি জমা হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তির বাহ্যিক অবয়ব রোগা হতে পারে। এছাড়া ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো সমস্যা থাকলে রোগা মানুষেরও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তেল খাওয়ার নির্দিষ্ট সীমা: মাসে কতটুকু?
ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো রান্নার তেলের ব্যবহার কমানো। ডা. অভিজিৎ চৌধুরীর মতে, রান্নার তেল এক প্রকার ‘বিষ’। তিনি একটি গাণিতিক হিসাব দিয়ে জানিয়েছেন, একজন সুস্থ মানুষের মাসে ৫০০ মিলিলিটারের বেশি তেল গ্রহণ করা উচিত নয়। অর্থাৎ একটি চার জনের পরিবারে মাসে বড়জোর ২ লিটার ভোজ্য তেল কেনা উচিত। এর চেয়ে বেশি তেল গ্রহণ সরাসরি লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং মেদ জমতে সাহায্য করে।
ওষুধ কি আবিষ্কার হয়েছে?
অনেকেই ফ্যাটি লিভারের জন্য জাদুকরী ওষুধের খোঁজ করেন। তবে চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি সারিয়ে তোলার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ বাজারে আসেনি। তবে আশার কথা হলো, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কার্যকরী ওষুধ বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ওষুধ এলেও জীবনযাত্রার পরিবর্তন ছাড়া এই রোগ থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়।
ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের কার্যকর উপায় যকৃৎ বা লিভার ভালো রাখতে বিশেষজ্ঞরা প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:
১. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি:ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ওজন কমানো। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্যক্তি যদি তার বর্তমান ওজনের মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারেন, তবে লিভারের ফ্যাট দ্রুত কমতে শুরু করে। তবে ডায়েট করতে গিয়ে হঠাৎ না খেয়ে থাকা বা দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করা বিপজ্জনক। এতে লিভারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সময় নিয়ে সঠিক সুষম খাদ্যের মাধ্যমে ওজন কমানো উচিত।
২. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: সাদা চালের ভাত বা সাদা আটার বদলে লাল চাল বা লাল আটার রুটি খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফাইবার বা আঁশযুক্ত শাকসবজি এবং ফলমূল প্রতিদিন খেতে হবে। চিনিযুক্ত পানীয়, মিষ্টি এবং অতিরিক্ত শর্করা পুরোপুরি বর্জন করা জরুরি। প্রোটিনের উৎস হিসেবে চর্বিহীন মাংস বা ডাল গ্রহণ করা যেতে পারে।
৩. কায়িক পরিশ্রম ও ঘাম ঝরানো: ফ্যাটি লিভারের একমাত্র অঘোষিত ‘ওষুধ’ হলো পরিশ্রম। চিকিৎসকদের মতে, শুধু হাঁটলেই হবে না, এমন পরিশ্রম করতে হবে যাতে শরীর থেকে ঘাম ঝরে। সাইকেল চালানো, দৌড়ানো বা বাড়ির ভারী কাজ করা লিভারের চর্বি গলাতে সাহায্য করে। অলস জীবনযাপন লিভারের শত্রু।
৪. পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান:** লিভার ভালো রাখতে পানির বিকল্প নেই। তবে কৃত্রিম চিনিযুক্ত কোমল পানীয় বা রাস্তার খোলা শরবত পরিহার করতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করলে শরীরের টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায় এবং মেটাবলিজম উন্নত হয়।
লিভার আমাদের শরীরের একটি মৌন অঙ্গ। এটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। তাই রোগা বা মোটা—সব ধরনের মানুষেরই উচিত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনা। চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং তেলের ব্যবহার সীমিত করার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামই পারে আপনার লিভারকে সুস্থ রাখতে। মনে রাখবেন, লিভার সুস্থ থাকলে আপনার শরীরও ফিট থাকবে।”
