আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজতে শুরু করেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এই নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রচারণাকে সামনে রেখে বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠ পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং জনমত গঠনের লক্ষে দেশব্যাপী ধারাবাহিক সফরের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আগামী ২২ জানুয়ারি (বুধবার) থেকে তার এই বিশেষ নির্বাচনী সফর ও জনসংযোগ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিন দিনের এই ঠাসা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে নির্বাচনের বার্তা পৌঁছে দেবেন।
গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডা. শফিকুর রহমানের এই নির্বাচনী সফরের বিস্তারিত সূচি গণমাধ্যমকে জানানো হয়। কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলমের স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আমিরে জামায়াত পর্যায়ক্রমে ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় নির্বাচনী জনসভা ও গণসংযোগে অংশ নেবেন। দলের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জনগণের সামনে তুলে ধরাই এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য।
নির্বাচনী সফরের প্রথম দিন অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকায় নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করবেন ডা. শফিকুর রহমান। সূচি অনুযায়ী, এদিন তিনি ঢাকা-১৫ আসনে (মিরপুর-কাফরুল এলাকা) ব্যাপক গণসংযোগ চালাবেন। উল্লেখ্য যে, এই আসনটি জামায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। গণসংযোগ পরবর্তী এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তার বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি রাজধানীর এই জনসভায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর কর্মসূচি শেষ করে সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৩ জানুয়ারি (শুক্রবার) উত্তরবঙ্গ সফরে যাবেন আমিরে জামায়াত। শুক্রবার জুমআর নামাজের পর দুপুর ২টা থেকে তার সফরসূচি অত্যন্ত ব্যস্ততম হয়ে উঠবে।
এদিন বেলা ২টায় দিনাজপুর জেলা জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-ই-শহীদ বড় ময়দানে এই সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হবে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই বিশাল ময়দানে বিপুল সংখ্যক জনসমাগমের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। দিনাজপুর সফর শেষে একই দিন বিকাল ৪টায় তিনি ঠাকুরগাঁও জেলায় পৌঁছাবেন এবং সেখানে জেলা শাখা আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের কর্মসূচি সমাপ্ত করে সন্ধ্যা নাগাদ তিনি বিভাগীয় শহর রংপুরে প্রবেশ করবেন। বিভাগীয় নগরী রংপুরে আয়োজিত পৃথক একটি বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা প্রদান করবেন। একদিনে উত্তরবঙ্গের তিন গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের তৃণমূল পর্যায়ে সংহতির পরিচয় দিতে চায়।
সফরের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২৪ জানুয়ারি (শনিবার) সকালেই ডা. শফিকুর রহমান জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক ও প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করতে পীরগঞ্জের বাবনপুরে যাবেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অকাতরে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আবু সাঈদের সমাধি জিয়ারতের পর ডা. শফিকুর রহমান মরহুমের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাবেন। রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, শহীদ আবু সাঈদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মাধ্যমে ডা. শফিকুর রহমান চলমান বিপ্লব ও নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষাকে আরও দৃঢ়ভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন।
এরপর ওই দিন সকাল ১০টায় গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলায় আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন আমিরে জামায়াত। পলাশবাড়ীসহ আশেপাশের এলাকার জনগণের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই জনসভাই হবে তিন দিনের সফরের চূড়ান্ত কর্মসূচি।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রবল কৌতূহল ও প্রত্যাশা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর এই নির্বাচনী সফর মূলত জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং বিগত দিনে আওয়ামী দুঃশাসনে নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভ নিরসনের এক বিশেষ প্রয়াস। আবু সাঈদের মতো বীরদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী বাংলাদেশে সুস্থ রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তন এবং নির্বাচনী সংস্কারের প্রশ্নে জনমত তৈরিই এই সফরের মূল সুর।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডা. শফিকুর রহমানের এই সফরের প্রস্তুতি গ্রহণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল এবং অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি জনসভাকে সার্থক ও সফল করতে নেতা-কর্মীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। জামায়াতের তৃণমূল স্তরের নেতৃবৃন্দের ধারণা, উত্তরবঙ্গের এই সফর শুধু নির্বাচনের প্রচারই নয়, বরং ছাত্র-জনতার বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনের অংশ হিসেবে কাজ করবে।
সার্বিকভাবে, ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারির এই ত্রিমুখী কর্মসূচি বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ভোটারদের পরিষ্কার ধারণা দেবে এবং আগামীর এক ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ পাঠ করাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের বিশ্বাস। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনী জনসভাগুলো সফল করতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করা হয়েছে।
