চীনে নির্ভরতা কমাতে ভারতের ‘বিরল মৃত্তিকা ম্যাগনেট’ মিশন

চীনে নির্ভরতা কমাতে ভারতের ‘বিরল মৃত্তিকা ম্যাগনেট’ মিশন: ৭৩০০ কোটি রুপির মেগা পরিকল্পনা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা ‘গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন’-এর অন্যতম কৌশলগত ক্ষেত্র ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল মৃত্তিকা উপাদানজাত ম্যাগনেট উৎপাদনে নিজেদের স্বয়ম্ভরতা নিশ্চিত করতে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ভারত সরকার। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারত এই খাতে ৭৩০০ কোটি রুপি (প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি বিশেষ প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এর প্রাথমিক লক্ষ্য হলো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে আনা এবং দেশীয় প্রযুক্তিকে বিশ্বমানে উন্নীত করা।


আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট’ ছাড়া প্রাত্যহিক জীবন কল্পনা করা অসম্ভব। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এগুলোর কার্যকারিতা অত্যন্ত প্রবল। বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV), বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (Wind Turbine), স্মার্টফোন, অত্যাধুনিক মেডিকেল স্ক্যানার এবং সামরিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রতিটি পর্যায়ে এই স্থায়ী বা পার্মানেন্ট ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে সবুজ জ্বালানির দিকে বিশ্ব যখন দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, তখন বৈদ্যুতিক মোটর ও টারবাইনের জন্য এই খনিজ হয়ে উঠেছে অমূল্য।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজ প্রক্রিয়াকরণের প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে চীন। ভারত তার মোট চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ম্যাগনেট চীন থেকে আমদানি করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই ভারত ২২১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ম্যাগনেট ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল আমদানি করেছে। এই ব্যাপক আমদানি নির্ভরতা দূর করতেই মূলত মোদি সরকার এই বিশাল আর্থিক প্রকল্পের পথে হেঁটেছে।


নতুন এই প্রকল্পের আওতায় সরকার ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’ বা উৎপাদন-ভিত্তিক বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব করেছে। এতে নির্বাচিত উৎপাদকরা তাদের বিনিয়োগ ও বিক্রয়লব্ধ লাভের ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা পাবেন। সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী সাত বছরের মধ্যে বছরে ৬০০০ টন উচ্চমানের পার্মানেন্ট ম্যাগনেট উৎপাদন করা। ভারতের সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী পাঁচ বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে, আর সেই চাহিদাকে সফলভাবে সামাল দিতে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই।


ভারত সরকার যে এই কঠোর সিদ্ধান্তের দিকে কেন এগিয়েছে, তার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। গত বছর চীনের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক বিরোধের জের ধরে বেইজিং হঠাৎ করে বিরল মৃত্তিকা উপাদান রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। এর ফলে ভারতের গাড়ি নির্মাতা এবং ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলো চরম সংকটের মুখে পড়ে। সেই ধাক্কা ছিল সাময়িক, কিন্তু তা একটি দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা দিয়ে গেছে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নির্দিষ্ট বিরল মৃত্তিকা কৌশল না থাকলে যে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে, তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এই সংকট থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোও বিকল্প সন্ধানে মাঠে নেমেছে।


কেবল বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান দিয়ে এই সেক্টরে সাফল্য পাওয়া যে সম্ভব নয়, তা মনে করিয়ে দিয়েছেন শিল্প ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। ভারত বর্তমানে আইটি (IT) খাতে শক্তিশালী হলেও ম্যাগনেট তৈরির শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক কারুকার্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানির মতো দেশের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে। ভারতের এই মুহূর্তে বাণিজ্যিক পর্যায়ে বৃহৎ আকারের ম্যাগনেট তৈরির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে।

বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্সের পরামর্শক নেহা মুখার্জী জানিয়েছেন, “এটি অবশ্যই সঠিক দিশায় একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, কিন্তু কেবল অর্থ দিয়েই এটি সম্পন্ন হবে না। ভারতকে এখন কৌশলগত বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করতে পারে এবং সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারে।” ন্যাশনাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (NGRI)-এর প্রধান বিজ্ঞানী ড. পিভি সুন্দর রাজুও একমত হয়ে জানান যে, কেবল অর্থ নয়, পণ্য উৎপাদনের জন্য চাই সুদূরপ্রসারী গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) অবকাঠামো।


ভারত বর্তমানে বিরল খনিজ সম্পদের বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভাণ্ডারের মালিক। কেরালা, তামিলনাড়ু, ওড়িশা ও গুজরাটের উপকূলীয় বালুকাস্তুপে বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ রেয়ার আর্থ মিনারেল সঞ্চিত রয়েছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই সম্পদের এক শতাংশও বর্তমান ভারত উত্তোলন করতে পারে না। বর্তমানে কেবল অন্ধ্রপ্রদেশে একটি খনি সক্রিয় রয়েছে। ইতিপূর্বে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে এর অধিকাংশ জাপানে রপ্তানি হতো। তবে ২০২৫ সালের জুনে সরকার দেশীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইন্ডিয়ান রেয়ার আর্থস লিমিটেডকে (IREL) সেই রপ্তানি স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।


সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো খনিজ উপাদানের ধরণ। স্থায়ী ম্যাগনেট তৈরিতে প্রয়োজন ‘লাইট’ ও ‘হেভি’—উভয় ধরণের রেয়ার আর্থ মেটাল। ভারতে হালকা খনিজ যেমন নিওডাইমিয়াম প্রচুর পরিমাণে থাকলেও ডাইসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম-এর মতো অতিপ্রয়োজনীয় ‘হেভি’ খনিজ পাওয়া প্রায় দুষ্কর। অর্থাৎ যদি ম্যাগনেট ভারতে তৈরিও হয়, তবে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান রাসায়নিক উপদান হয়তো আবারও চীন থেকেই কিনে আনতে হবে। এর পাশাপাশি রয়েছে চিনা পণ্যের অতি সস্তা মূল্যের প্রভাব। চিনা ম্যাগনেট অত্যন্ত সস্তায় বাজারে পাওয়া যায়, আর সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ম্যাগনেটের দাম যদি প্রতিযোগিতামূলক না হয়, তবে পুরো উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে।


বাধার প্রাচীর বিশাল হলেও আশার আলো যে নেই, তা নয়। সরকার ইতোমধ্যেই ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন’ (NCMM) গঠন করেছে। ২০২৩ সালে ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে একটি অত্যাধুনিক প্ল্যান্ট চালু হয়েছে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৫০০০ টন ম্যাগনেট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ রাজনিশ গুপ্তা (EY India) মনে করেন, উদ্যোক্তাদের শক্তি এবং সরকারের নীতি সঠিক থাকলে একটি পরিপূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠা কেবল সময়ের অপেক্ষা। হয়তো রাতারাতি লক্ষ্য পূরণ হবে না, কিন্তু এখন থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে চিরকাল চীনের দয়ায় বসে থাকতে হবে। সব বাধা কাটিয়ে ভারত যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তবে সেটি হবে এশিয়ার তথা বিশ্বের প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতিতে ভারতের একটি বড় জয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন