বিশ্বসংগীতের মানচিত্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম দক্ষিণ কোরিয়ান বয়-ব্যান্ড ‘বিটিএস’ (BTS)। দীর্ঘ প্রায় চার বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই জনপ্রিয় গ্রুপটি আবারো পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম নিয়ে সংগীতাঙ্গনে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের আসন্ন এই অ্যালবামের নাম রাখা হয়েছে ‘আরিরাং’ (Arirang), যা কোরিয়ান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। গত বৃহস্পতিবার গ্রুপটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নাম ঘোষণা করা হয়। আগামী ২০ মার্চ ২০২৬-এ অ্যালবামটি বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে যাচ্ছে, যা নিয়ে বর্তমান বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উন্মাদনার কোনো কমতি নেই।
বিটিএসের আসন্ন এই অ্যালবামের নাম ‘আরিরাং’ নির্বাচনের পেছনে রয়েছে এক সুগভীর দেশপ্রেম এবং কোরিয়ানদের আবেগের ইতিহাস। ‘আরিরাং’ কোনো সাধারণ গান নয়, বরং এটি কোরিয়ার কয়েক শ বছরের পুরোনো এবং পরম জনপ্রিয় একটি লোকসংগীত। এই গানটির প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে আছে কোরিয়ান জনগণের যাপিত জীবন, বিরহ, বেদনা এবং সংগ্রামের ইতিহাস। ‘আরি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘সুন্দর’ এবং ‘রাং’ শব্দের অর্থ ‘প্রিয়জন’। সম্মিলিতভাবে এর তাৎপর্য দাঁড়ায়— সুন্দরের সাধনা ও ভালোবাসার মেলবন্ধন।
বিগ হিট মিউজিক এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিটিএস এই অ্যালবামে তাদের শিকড়কে অর্থাৎ কোরিয়ান লোকজ সুর ও আবেগকে বিশ্বের দরবারে এক নতুন রূপে তুলে ধরেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুখে মুখে বয়ে চলা এই গানটির মাধ্যমেই আরএম, জিমিন, জাংকুকরা নিজেদের অন্তরের আকুলতা এবং ভক্তদের প্রতি তাদের অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
গত চার বছরের বিরতির মাঝে গ্রুপটি ব্যক্তিগত সামরিক সেবা ও একক ক্যারিয়ারের পেছনে সময় দিলেও, ব্যান্ডের সংহতি অটুট রেখে ২০২৫ সালের শেষভাগে ‘আরিরাং’ অ্যালবামের রেকর্ডিং সম্পন্ন করেছে। জানা গেছে, এই পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামে মোট ১৪টি মৌলিক গান থাকবে। বিটিএস তাদের পূর্ববর্তী ২০২০ সালের জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘ম্যাপ অব দ্য সোল: সেভেন’ (Map of the Soul: 7)-এর পর আর কোনো পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম নিয়ে কাজ করেনি। মাঝে ২০২২ সালে তাদের একটি অ্যান্থোলজি অ্যালবাম ‘প্রুফ’ (Proof) প্রকাশিত হয়েছিল, তবে সেখানে পুরোনো গানের সংকলনই প্রধান্য পেয়েছিল। সেই বিচারে ‘আরিরাং’ হতে যাচ্ছে বিটিএসের শৈল্পিক পরিপক্কতার এক অনন্য নতুন পরিচয়।
নতুন অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণার পাশাপাশি বিটিএস ভক্তদের জন্য আরও একটি বড় সুখবর হচ্ছে তাদের আসন্ন ওয়ার্ল্ড ট্যুর। দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংগি প্রদেশের ঐতিহাসিক গোইয়াং স্পোর্টস কমপ্লেক্স থেকে আগামী ৯ এপ্রিল এই দীর্ঘ সফরের শুভ সূচনা হবে। গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্বখ্যাত ফ্যানডম প্ল্যাটফর্ম ‘উইভার্স’-এ একটি পোস্টারের মাধ্যমে এই বিশাল ভ্রমণের নির্ঘণ্ট বা সূচি প্রকাশ করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার বিটিএস ৩৪টি বড় শহরের প্রাণকেন্দ্রে মোট ৭৯টি লাইভ কনসার্টে পারফর্ম করবে। উল্লেখ্য যে, ইতিহাসে এটিই কোনো কে-পপ গ্রুপের একক ট্যুরে সর্বাধিক সংখ্যক শো হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। বিটিএস তাদের বর্ণাঢ্য এই যাত্রায় উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ার দেশগুলোকে স্পর্শ করবে। ২০২২ সালে লাস ভেগাসের সফল শোর পর গ্রুপটিকে এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের রাজপথে একত্রে দেখার সুযোগ মেলেনি, ফলে এই ওয়ার্ল্ড ট্যুরকে ঘিরে পৃথিবী জুড়ে সাজ সাজ রব বিরাজ করছে।
কোরিয়ার নিজ মাঠের কনসার্ট শেষ করে বিটিএস তাদের ট্যুর নিয়ে পাড়ি জমাবে সুদূর আটলান্টিকের ওপাড়ে। আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে ফ্লোরিডার মনোরম আবহে উত্তর আমেরিকা পর্ব শুরু হবে। মহাদেশটির ১২টি আধুনিক শহরের দর্শকদের জন্য তারা বরাদ্দ রেখেছে ২৮টি বিশাল শো। এরপর জুন থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলবে ইউরোপের উন্মাদনা। ইউরোপীয় ভক্তদের মাতাতে বিটিএস লন্ডন, প্যারিসসহ পাঁচটি শহরে মোট ১০টি একক কনসার্টে গান শোনাবে।
ট্যুরটির অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকা সফর। এই পর্বে ফুটবল ও কফি সম্রাটদের দেশ ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসসহ পাঁচটি প্রধান শহরে ঝড় তুলবে এই সাত কোরিয়ান সুপারস্টার। কোরিয়া হেরাল্ডসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, বিটিএসের এই সফরের টিকিটের চাহিদা বর্তমান বাজারের সকল রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘আরিরাং’ গানটি কেবল ধানক্ষেতে কাজ করার সুর কিংবা প্রতিবাদী কণ্ঠের সঙ্গী নয়, বরং এটি কোরিয়ানদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। বিটিএস যখন তাদের চার বছর বিরতি পরবর্তী প্রত্যাবর্তনের জন্য এই লোকসংগীতের নাম ধারণ করেছে, তখনই বোঝা গিয়েছিল তারা এবার বিশ্ব জয় করার নতুন অস্ত্র হিসেবে নিয়ে এসেছে নিজেদের ঐতিহ্যকে। একদিকে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এবং অন্যদিকে রেকর্ডব্রেকিং আন্তর্জাতিক কনসার্ট—এই দ্বৈত আকর্ষণে বিটিএস ২০২৬ সালকে আবারো ‘আর্মিদের’ (বিটিএস ভক্ত) বছর হিসেবে রাঙাতে বদ্ধপরিকর। আগামী ২০ মার্চ এবং ৯ এপ্রিল কেবল দুটি তারিখ নয়, এটি হবে কে-পপ সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক বিবর্তনের মাইলফলক।
