ইসলামী আন্দোলনের জোটত্যাগেও আশাবাদী জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ইসলামী আন্দোলনের জোটত্যাগেও আশাবাদী জামায়াত, ইশতেহার ও রাষ্ট্র পরিচালনার ‘পলিসি পেপার’ চূড়ান্ত পর্যায়ে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গত শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনে লড়াই করার ঘোষণা দিলেও, জামায়াতে ইসলামী তাদের জন্য আলোচনার পথ এখনও খোলা রেখেছে। একইসাথে নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে দলীয় ইশতেহার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আধুনিক রূপরেখা বা ‘পলিসি পেপার’ চূড়ান্ত করতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছে দলটি।


শনিবার (১৮ জানুয়ারি) ঢাকার মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানul মাহবুব জুবায়ের জানান, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট ত্যাগের ঘোষণা দিলেও তাদের জোটে ফেরার সুযোগ ফুরিয়ে যায়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সবার জন্যই জামায়াতের দরজা খোলা আছে।”

উল্লেখ্য, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ ছিল ইসলামী আন্দোলন। কিন্তু আসন ভাগাভাগি নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের জেরে তারা শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে একক নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বড় দলগুলোর সাথে ছোট দলগুলোর দরকষাকষি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে জোটের বৃহত্তর সংহতি বজায় রাখা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দলগুলোর জন্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।


ইসলামী আন্দোলনের জন্য জামায়াত জোট প্রাথমিকভাবে ৪৭টি আসন সংরক্ষিত রেখেছিল। এখন এই আসনগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আসনগুলোর বিষয়ে পুনরায় পর্যালোচনা করার দায়িত্ব জোটের লিয়াজোঁ কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। তারা সকল অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করবে। পরবর্তীতে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব বসে লিয়াজোঁ কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

একই দিনে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সংবাদিকদের জানান, যেহেতু একটি বড় অংশ জোট ত্যাগ করেছে, তাই ইসলামী আন্দোলনের জন্য নির্ধারিত ৪৭টি আসন এখন জোটে থাকা বাকি ১০টি দলের মধ্যে যৌক্তিক ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে। এর ফলে জোটে থাকা অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জোটের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যারা আগে ৩০টি আসন পেয়েছিল, তারা এখন অন্তত আরও ১৫টি অতিরিক্ত আসনের প্রত্যাশা করছে।


ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী কেবল নির্বাচনী প্রচার নয়, বরং সুশাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শনিবার সকাল থেকে আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে ইশতেহার চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্র জানায়, কেবল নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং জামায়াত এবার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ‘পলিসি পেপার’ তৈরি করেছে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জুবায়ের বলেন, “একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই নীতি প্রয়োজন। আমাদের বিশেষজ্ঞ দল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কৃষি ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে পলিসি পেপারগুলো বৈঠকে পেশ করেছেন। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এগুলো সাধারণ জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকল মহলের জন্য প্রকাশ করা হবে এবং দলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।” এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জামায়াতের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখার সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন।


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জামায়াত এই নির্বাচনকে অস্তিত্ব রক্ষার এবং জাতীয় পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রচারণার সূচি নির্ধারণেও বৈঠকটি গুরুত্ব পেয়েছে। জুবায়ের জানান, আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ধারাবাহিক নির্বাচনী সফর শুরু হবে। এই সফরে জামায়াত তাদের দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি জোটগত প্রার্থীদের পক্ষেও ভোট প্রার্থনা করবে। ইশতেহারে কর্মসংস্থান, যুব উন্নয়ন এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় গুরুত্বের সাথে উঠে আসবে বলে জানা গেছে।


ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটে ফিরবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্নের বিষয়। তবে জামায়াতের ‘খোলা দরজা’ নীতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তলে তলে সংলাপের একটি সুক্ষ্ম সুতা এখনও কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে, মামুনুল হকের মধ্যস্থতা এবং লিয়াজোঁ কমিটির তৎপরতা জোটে থাকা অবশিষ্ট ১০টি দলের মধ্যে শক্তি বৃদ্ধির পথ দেখাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে আগামী দিনগুলোতে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতা গড়ে ওঠে কি না, সেদিকেই নজর রাখছেন দেশের আপামর সাধারণ মানুষ।

সার্বিকভাবে, জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতার পরিচয় দিতে চায়। দলীয় ইশতেহার এবং বিশেষজ্ঞদের তৈরি পলিসি পেপারের মাধ্যমে তারা একটি আধুনিক প্রগতিশীল অথচ ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত সব দলের অংশগ্রহণ এবং ভোটের মাধ্যমে একটি জনবান্ধব সংসদ গঠিত হবে— এটাই দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন