বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি বাজার গবেষণা সংস্থা ‘ইপসস’ (Ipsos) তাদের মন্থর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিকে চাঙা করতে এবং বাজার গবেষণায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে এক বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জ্যঁ-লরেন পোইতু জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ইপসস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কৌশলগত অধিগ্রহণের জন্য মোট ১২০ কোটি ইউরো (প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে।
বুধবার (২২ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পোইতু এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়া টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার দখল পুনর্বহাল করতেই এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জ্যঁ-লরেন পোইতু বলেন, এই ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ দুটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা হবে। প্রথমত, কৌশলগত ও বিশেষ প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন কোম্পানি অধিগ্রহণ করা, যাতে বাজার গবেষণার বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত, সংস্থার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো, যার মধ্যে মেধাবী প্রকৌশলী এবং তথ্য বিজ্ঞানী (Data Scientists) নিয়োগ অন্যতম।
বর্তমানে ইপসস-এ ১,০০০-এর বেশি ডেটা সায়েন্টিস্ট এবং এআই ইঞ্জিনিয়ার কর্মরত আছেন। তবে সিইও জানিয়েছেন, এই সংখ্যা আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, “আগামী দিনে ইপসসের মেধাবী জনশক্তির মধ্যে ডেটা সায়েন্টিস্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৌশলীদের অনুপাত বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। মূলত প্রতিভাবান কর্মী সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নই আমাদের এই বিপুল বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি।”
বাজার গবেষণা সংস্থা হিসেবে ইপসস বিশ্বব্যাপী তাদের রাজনৈতিক জরিপ বা ‘পলিটিক্যাল পোলিং’-এর জন্য সুপরিচিত। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, প্রতিষ্ঠানটির নতুন এআই কেন্দ্রিক পরিকল্পনাগুলো রাজনৈতিক জরিপের চেয়ে বাণিজ্যিক গবেষণায় বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ইপসসের মোট আয়ের সিংহভাগ আসে বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য করা বাণিজ্যিক ও বিপণন গবেষণা থেকে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকদের দ্রুত এবং সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই হবে এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক জরিপ থেকে আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় সেটিকে এই প্রকল্পের আপাতত একটি ‘স্মলার সার্ভিস লাইন’ বা গৌণ সেবা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংস্থাটি তাদের এআই কাঠামোর বেশির ভাগ কোর বা মূল প্রযুক্তি নিজেই তৈরি করার পরিকল্পনা করছে অথবা সরাসরি মালিকানা কিনে নিতে আগ্রহী। তবে আর্থিক লক্ষ্য পূরণ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে তারা প্রয়োজনে বিভিন্ন বহিরাগত অংশীদারিত্বের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। পোইতু বিশ্বাস করেন, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের তথ্যের সুরক্ষা এবং বিশ্লেষণের গভীরতা আরও উন্নত করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বড় অঙ্কের ডেটা বা তথ্যের প্রয়োজন হয়। ইপসস মূলত তাদের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার এবং ‘সিন্ডিকেটেড স্টাডি’ (যেই গবেষণা একাধিক ক্লায়েন্টের কাছে বিক্রি করা হয়) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করবে। তবে যে সব গবেষণা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি বরাত অনুযায়ী তৈরি করা হয় (Proprietary Studies), সে ক্ষেত্রে ডেটার মালিকানা বা গোপনীয়তার বিষয়টি বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ইপসসের সিইও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, গ্রাহকদের মালিকানাধীন ডেটার ব্যক্তিগত সুরক্ষা বজায় রাখা তাদের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত।
ইপসস সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং মন্থর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১২০ কোটি ইউরোর এই বিপুল বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক গবেষণার বাজারে নেতৃত্বের আসনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। বর্তমানে বাজার গবেষণার ধরন বদলে যাচ্ছে। সনাতনী পদ্ধতির বদলে মানুষ এখন ‘বিগ ডেটা অ্যানালাইটিক্স’ এবং প্রেডিকটিভ এআই বা ভবিষ্যৎবাণী সক্ষম প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইপসস এই পরিবর্তনকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পথে পা বাড়িয়েছে।
এই বিনিয়োগের ফলে বাজার গবেষণা খাতে একটি নতুন প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হবে। মূলত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ১ ইউরোর বিনিময়ে শূন্য দশমিক ৮৫৪৬ মার্কিন ডলার হিসেবে এই বড় অংকের বাজেট তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইপসসের শেয়ারহোল্ডাররা এই নতুন ঘোষণাকে একটি ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখছেন এবং প্রত্যাশা করছেন ২০২৬ সাল পরবর্তী সময়ে সংস্থাটির শেয়ার এবং প্রবৃদ্ধিতে এই মেগা বিনিয়োগের দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটবে।
