বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে সুদের হার পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অদম্য গতিতে এগিয়ে চলেছে স্পেনের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ব্যাংকইন্টার’ (Bankinter)। চলতি ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের পরিধি বৃদ্ধি এবং ফি ও কমিশন থেকে আয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির এই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) মাদ্রিদ থেকে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ব্যাংকটির এই অভাবনীয় সাফল্যের চিত্র উঠে আসে। বাজার মূল্যের দিক থেকে স্পেনের পঞ্চম বৃহত্তম এই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতেও যেভাবে প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে, তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলছে।
ব্যাংকইন্টার-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে তাদের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৮০ লক্ষ (২৭৮ মিলিয়ন) ইউরো। অথচ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষকদের করা পূর্বাভাসে এই মুনাফা ২৭ কোটি ২০ লক্ষ ইউরো হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ব্যাংকটি বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক ভালো ফল করেছে।
কেবল চতুর্থ প্রান্তিকেই নয়, গোটা ২০২৫ সাল জুড়ে ব্যাংকইন্টার তাদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিয়েছে। ২০২৫ সালের সামগ্রিক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ১৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৯ কোটি (১.০৯ বিলিয়ন) ইউরোতে। এক্ষেত্রেও ব্যাংকটি ১০৮ কোটি ইউরোর পূর্বাভাসকে টপকে যেতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ রিটেইল ব্যাংক কেবল সুদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আয়ের বহুমুখীকরণ বা ‘নন-কোর ব্যাংকিং’ খাতের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। ব্যাংকইন্টার-এর ক্ষেত্রেও এই নীতি দারুণ কাজে লেগেছে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট ফি এবং কমিশন থেকে আসা আয় বার্ষিকভিত্তিতে ১০.৯ শতাংশ বেড়েছে। পুরো বছরের হিসাব করলে এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশ।
অন্যদিকে, স্পেনের অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতি তুলনামূলক শক্তিশালী থাকায় ব্যাংকইন্টার গত এক বছরে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের লোন পোর্টফোলিও ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক খাতে ঋণের এই চাকা সচল থাকা ব্যাংকটির তারল্য প্রবাহ ও মুনাফা বাড়াতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
স্পেনের ব্যাংকগুলো মূলত ‘রিটেইল লেন্ডিং’ বা খুচরা ঋণ প্রদানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। সুদের হার উচ্চ থাকা অবস্থায় তারা ঋণের ওপর অতিরিক্ত আয় করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বৈশ্বিক পর্যায়ে সুদের হার কিছুটা কমানোর ফলে অনেক ব্যাংক সংকটে পড়েছিল। সুদের হার কমলে লেন্ডিং ইনকাম বা ঋণের মাধ্যমে হওয়া মুনাফা সাধারণত কমে যায়।
ব্যাংকইন্টার-এর সামগ্রিক বার্ষিক নিট সুদ আয় বা ‘নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম’ (NII) গত এক বছরে ১.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২২৪ কোটি (২.২৪ বিলিয়ন) ইউরোতে ঠেকেছে। ঋণের ওপর অর্জিত আয় থেকে আমানতের খরচ বিয়োগ করার পর যে অর্থ থাকে তাকেই মূলত NII বলা হয়। পুরো বছরে আয় কমলেও গত চতুর্থ প্রান্তিকে অর্থাৎ শেষ তিন মাসে এই নিট সুদ আয় হঠাৎ করে ৪ শতাংশ বেড়ে ৫৭ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে। এটিও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ৫৬ কোটি ৬০ লক্ষ ইউরোর চেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার কমার ঝুঁকি থাকলেও ব্যাংকটি আমানতের ব্যয় কমিয়ে এবং বড় অংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করতে সফল হয়েছে। বছরের শুরুতে কিছুটা স্থবিরতা থাকলেও শেষ তিন মাসের এই দ্রুত উত্তরণ নির্দেশ করে যে স্প্যানিশ ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কাটিয়ে উঠেছে।
স্পেনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ব্যাংকইন্টার-এর সাফল্যের অন্যতম বড় স্তম্ভ। দেশটিতে শিল্পায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (SME) বিস্তার ঘটার কারণে ঋণের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া গ্রাহকদের কেনাকাটার ঝোঁক ও ব্যয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলো এখন তাদের বিভিন্ন পরিসেবা যেমন—কার্ড চার্জ, লেনদেন ফি এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোটা অংকের কমিশন আয় করছে।
বাজার বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্প্যানিশ ব্যাংকগুলোর এই স্থিতিস্থাপকতা সামগ্রিকভাবে ইউরোপের বাজারের জন্যও ভালো সংকেত। রিটেইল ব্যাংকিংয়ে আধিপত্য ধরে রাখা ব্যাংকইন্টার প্রমাণ করেছে যে, যখন সুদের হারের সুফল ফুরিয়ে যায়, তখন সঠিক দক্ষ পরিচালনা এবং সেবামূলক আয়ের বৃদ্ধি একটি প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষে রাখতে পারে।
ব্যাংকটির এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্টক মার্কেটেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। মাদ্রিদ স্টক এক্সচেঞ্জে (BKT.MC) ব্যাংকটির শেয়ার দর নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আগামীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাংকটি এখন নজর দিচ্ছে তাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিষেবাকে আরও উন্নত করতে, যাতে প্রযুক্তির সহায়তায় আয়ের উৎস আরও বাড়ানো যায়।
ব্যাংকইন্টার-এর প্রধান নির্বাহীর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালেও তাঁরা তাঁদের প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবেন। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং সুদের হারের ওঠা-নামার ওপর নজর রাখা জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন।
সামগ্রিকভাবে, ব্যাংকইন্টার কেবল স্পেনের পঞ্চম বৃহৎ ব্যাংক হিসেবেই নয়, বরং স্মার্ট বিনিয়োগ এবং গ্রাহক সেবা উন্নয়নের মাধ্যমে মুনাফার পাহাড় গড়ার অনন্য এক নজির স্থাপন করল ২০২৫ সালের বার্ষিক খতিয়ানে।
