“দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, অন্য কোনো দেশ নয়—সবার আগে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।”—এই অমোঘ এবং দেশপ্রেমিক স্লোগানকে সামনে রেখে নিজের নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই রাজপথ কাঁপালেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে এক বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে সাধারণ মানুষ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে থাকবে জিরো টলারেন্স নীতি।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে এই আবেগঘন বার্তা দেন। সকাল থেকেই কানায় কানায় পূর্ণ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে যখন বিএনপি প্রধান উপস্থিত হন, তখন জনসমুদ্র গর্জে ওঠে দলীয় এবং ব্যক্তি স্লোগানে। বিশেষ করে স্থানীয়দের মধ্যে ‘দুলাভাই’ (সিলেটের জামাতা হওয়ার কারণে) সম্বোধনে যে হিল্লোল ওঠে, তাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে অভিনন্দন গ্রহণ করেন তারেক রহমান।
নিজের বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, “আমরা যেমন দিল্লির কাছে মাথা নত করব না, তেমনি পিন্ডি বা অন্য কোনো দেশের করুণার ওপর এই দেশ চলবে না। আমাদের রাজনৈতিক শক্তির উৎস অন্য কোনো ভূখণ্ড নয়, বরং এ দেশের তৃণমূলের কোটি কোটি মানুষ। বিএনপি বিশ্বাস করে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নই হলো রাজনীতির পরম লক্ষ্য।”
সাবেক সরকারের দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের আমলকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “যারা ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আসা এই দেশটিকে বিগত সময়ে হঠকারিতা এবং লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, দেশের মানুষ তাদের চরিত্র ইতিমধ্যেই দেখে নিয়েছে। মা-বোনদের সম্মানহানি এবং দেশবিরোধী অপশক্তির মদদদাতা কারা ছিল, তা এখন পরিষ্কার। এই স্বৈরচারী ব্যবস্থার কুফরির বিরুদ্ধে এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে আজ পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
তারেক রহমানের বক্তব্যের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক ঘরানার প্রশ্নবাণ। সমাবেশের এক পর্যায়ে তিনি সরাসরি মানুষের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন—পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, কাবা শরিফ এবং জান্নাত-জাহান্নামের মালিক কে? পুরো সমাবেশ থেকে যখন হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠের উত্তর আসে ‘আল্লাহ’, তখন তিনি রাজনৈতিক একটি তুলনামূলক আলোচনা সামনে আনেন। তিনি বলেন, “যে সব কিছুর মালিক একমাত্র স্রষ্টা, সেই মালিকানা মানুষের নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি নির্বাচনের আগে কিছু রাজনৈতিক শক্তি এমন প্রতিশ্রুতি দেয় যা সরাসরি আল্লাহর ক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার শামিল। এটাকে কী শিরক বলা যায় না? যারা স্রষ্টার মালিকানাধীন বিষয়ের দোহাই দিয়ে জনগণকে ঠকাতে পারে, নির্বাচনের পর তারা আপনাদের কী ভয়ানক মাত্রায় ঠকাবে তা ভাববার বিষয়।” তিনি সতর্ক করে বলেন, হঠকারী রাজনীতি এবং ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলোয়াড়দের প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে।
বিএনপি প্রধান বিগত সরকারের সময়কালের নির্বাচনী ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে বলেন, ১৫-১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তিনি ডামি নির্বাচন, নিশিরাতের নির্বাচন এবং ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ের নানা উপাখ্যান তুলে ধরে বলেন, উন্নয়ন নামক মিথ্যে ফানুস উড়িয়ে জনগণের সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক ভিত গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে পরনির্ভরশীল করে তোলার চক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এখন ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার) আন্দোলনে প্রতিটি মানুষকে স্বাবলম্বী করার অঙ্গীকার করেন তিনি। শুধু ভোটের অধিকার নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সাবলম্বী হওয়াকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।
সিলেটের মাটি ও মানুষের আবেগ হিসেবে পরিচিত বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর কথা এদিন বার বার স্মরণ করা হয়। সমাবেশ স্থলের পোস্টার, ব্যানার এবং বক্তব্যে ইলিয়াস আলীসহ সকল গুম হওয়া নেতাদের নাম বারবার প্রতিধ্বনিত হয়। তারেক রহমান অত্যন্ত বেদনার সাথে তাঁর বক্তব্যে ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গ টানেন। সমাবেশে নিখোঁজ ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা বসার জায়গাও রাখা হয়েছিল, যা আগতদের মনে ক্ষোভ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ অতিথি হিসেবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ইলিয়াস আলী এবং সকল শহীদ ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করার আহ্বান জানান।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক সমাবেশ শুরু হয়। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিলে মিছিলে সমাবেশস্থল প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বিএনপির পতাকার রঙের মাথায় টুপি এবং কপালে ফিতা বেঁধে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ছিল দেখার মতো। সমাবেশ শেষে দুপুর ১টার দিকে তারেক রহমান সিলেট ত্যাগ করে সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তবে তাঁর এই যাত্রা ছিল একটি লম্বা প্রচার মিছিলের মতো।
সড়কপথে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার পথে তিনি ছয়টি জেলায় আরও ছয়টি স্থানে নির্ধারিত জনসভায় অংশ নেবেন। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন মৌলভীবাজারের শেরপুর, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদীর পৌর পার্ক এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার গাউসিয়া এলাকায় সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। প্রতিটি এলাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় এবং ধানের শীষের পক্ষে সমর্থন আদায়ের এই যাত্রাকে বিএনপি ‘জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের মহাসড়ক সফর’ হিসেবে দেখছে।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই সমাবেশে জুবাইদা রহমানসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ শেষে সিলেট বিমানবন্দর এলাকার হোটেল গ্র্যান্ড সিলেট-এ শতাধিক মেধাবী ও তরুণ শিক্ষার্থীদের সাথে তারেক রহমানের মতবিনিময় কর্মসূচিটি তরুণ ভোটারদের নজর কেড়েছে।
সার্বিকভাবে তারেক রহমানের সিলেট সফর যেন আগত জাতীয় নির্বাচনে দেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় ঘুড়িয়ে দেওয়ার এক বিশাল ইঙ্গিত। ‘দিল্লি নয় পিন্ডি নয়—বাংলাদেশই শেষ কথা’—স্লোগানটি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে একটি নির্ণায়ক মন্ত্র হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
