বৈশ্বিক মিডওয়াইফ সংকট: ঝুঁকির মুখে লাখ লাখ মা ও নবজাতকের জীবন

বিপজ্জনক মাত্রায় বৈশ্বিক মিডওয়াইফ সংকট: ঝুঁকির মুখে লাখ লাখ মা ও নবজাতকের জীবন

বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মিডওয়াইফ বা ধাত্রীর তীব্র সংকটে লক্ষ লক্ষ অন্তঃসত্ত্বা নারী মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দক্ষ মিডওয়াইফের অভাব কেবল একটি কর্মসংস্থান বা জনশক্তির অভাব নয়; এটি মূলত মা ও শিশুর জীবন-মরণ এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর সংকট।

আন্তর্জাতিক ধাত্রী সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ মিডওয়াইফস’ (আইসিএম)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘উইমেন অ্যান্ড বার্থ’-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়, সারা বিশ্বে নিরাপদ প্রসব এবং গর্ভকালীন পরিচর্যা নিশ্চিত করতে অন্তত ৯ লক্ষ ৮০ হাজার অতিরিক্ত মিডওয়াইফের প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে অন্তত ১৮১টি দেশে মিডওয়াইফদের এই অভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান।


গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মিডওয়াইফ বা প্রশিক্ষিত ধাত্রীর যে মোট সংকট রয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই রয়েছে আফ্রিকার মহাদেশে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আফ্রিকার প্রতি ১০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মধ্যে ৯ জনই এমন দেশে বাস করেন যেখানে প্রয়োজনীয় মিডওয়াইফ নেই। সেখানে মিডওয়াইফ জনশক্তির অভাব মেটানোর সক্ষমতা মাত্র ৪০ শতাংশ। অথচ যথাযথ মাতৃস্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক মানবিক অধিকার হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ৩১ শতাংশ এবং দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকায় ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের মতো তুলনামূলক উন্নত অঞ্চলেও কিছুটা জনবল সংকট রয়েছে, তবে তা উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর মতো এত ভয়াবহ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সারা বিশ্বের মিডওয়াইফ সংকটের ৯০ শতাংশই নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত।


গবেষণার অন্যতম লেখক এবং আইসিএম-এর প্রধান নির্বাহী আনা অফ উগলাস তাঁর বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দশ লক্ষাধিক মিডওয়াইফের ঘাটতি মানেই হচ্ছে বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা তার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে কর্মরত মিডওয়াইফরা অতিরিক্ত পরিশ্রমের শিকার হচ্ছেন এবং তাঁদের নামমাত্র মজুরি দিয়ে শোষণ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত প্রসূতি নারীরা খুব তড়িঘড়ি এবং নিম্নমানের স্বাস্থ্যসেবা পান, যা তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।”

আনা অফ উগলাস আরও জানান, পর্যাপ্ত দক্ষ লোকবল না থাকায় চিকিৎসায় অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং সিজারিয়ান সেকশনসহ অপারেশনজনিত ঝুঁকি বেড়ে যায়। নারীরা অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সঠিক ও মানসম্মত আচরণের পরিবর্তে অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন। সুতরাং, মিডওয়াইফদের পদ বৃদ্ধি কেবল নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি প্রতিটি মা ও শিশুর নিরাপদ আগামীর প্রশ্ন।


আগের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে আইসিএম বলেছে, যদি বিশ্বের প্রতিটি নারীর জন্য মানসম্পন্ন মিডওয়াইফ সেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান হারে সেবা বাড়ানো গেলে ২০৩৫ সাল নাগাদ প্রতি বছর গড়ে ৪৩ লক্ষ জীবন বাঁচানো সম্ভব। ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ ও মিডওয়াইফ সেবা নিশ্চিত করা হলে সেটি কেবলমাত্র সন্তান জন্মদানের সময়ের সুবিধা দেয় না; বরং জন্ম-পূর্বকালীন পরামর্শ, জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং স্ক্রিনিং পরীক্ষার ক্ষেত্রেও অসামান্য অবদান রাখে।

প্রতিবেদনের সহ-লেখক এবং আইসিএম-এর প্রধান ধাত্রী অধ্যাপক জ্যাকলিন ডাঙ্কলি-বেন্ট বর্তমান অব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “অনেক দেশেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফদের কর্মসংস্থানে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না অথবা তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এই অবহেলাই মূলত দক্ষ সেবিকা ও রোগীদের মধ্যে এক বিশাল দেয়াল তৈরি করেছে।”


জাতিসংঘ নির্ধারিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ বা এসডিজি ২০৩০-এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হার কমিয়ে আনা। তবে গবেষণার তথ্য মতে, মিডওয়াইফ জনবল বৃদ্ধির বর্তমান গতি খুবই মন্থর। গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান সংকট আরও অন্তত এক দশক বজায় থাকবে, যা এসডিজির ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও বহু উন্নয়নশীল রাষ্ট্র প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে।


আইসিএম-এর পক্ষ থেকে বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। সংস্থাটি তাদের বক্তব্যে দাবি করেছে যে, সরকারকে অবশ্যই স্বাস্থ্য বাজেটে মিডওয়াইফ খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যথাযথ পেশাগত সম্মান এবং আর্থিক সচ্ছলতা না দিলে কেউ এই মহৎ পেশায় নিযুক্ত থাকতে আগ্রহী হবে না। সরকারগুলোর প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে যাতে মিডওয়াইফদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করার আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয় এবং তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চাকুরীর নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন কাঠামোর ব্যবস্থা করা হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, যখন ধাত্রীবিদ্যাকে একটি সম্মানজনক এবং সুবিধাসম্পন্ন পেশা হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজ গ্রহণ করবে, তখনই এই খাতের সংকট দূর করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ ছাড়া একটি সুস্থ মা ও একটি নিরাপদ আগামীর প্রতিশ্রুতি কেবল কল্পনাই থেকে যাবে। বিশ্বব্যাপী মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা করতে এখনই সরকারকে ‘বোর্ড অফ পিস’-এর মতো বৃহত্তর উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন