শিশুর হাড় ও গিঁটে নীরব ঘাতক বাতরোগ

শিশুর হাড় ও গিঁটে নীরব ঘাতক বাতরোগ: লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞ সতর্কবার্তা

বাতরোগ বা রিউম্যাটিজম বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বয়োজ্যেষ্ঠ বা বৃদ্ধ মানুষের চিত্র। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান এক আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরছে—শৈশবও এখন এই জটিল রোগের থাবায় জর্জরিত। বাতরোগ বা শিশুদের ক্ষেত্রে যেটিকে ‘জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস’ (JIA) বলা হয়, তা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে শুধু বাধাগ্রস্তই করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রদাহজনিত ব্যাধি কেবল হাড়ের গিঁটে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা চোখ, হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকেও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলা রয়টার্সের এই বিশেষ প্রতিবেদনে বাতরোগের শিকার হওয়া শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো।

বাতরোগ কী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এটি কতটা ভয়াবহ?

বাতরোগ শরীরের বড় এবং ছোট জয়েন্ট বা গিঁটে তীব্র প্রদাহ, ফোলাভাব ও অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি করে। বড়দের ক্ষেত্রে বাতরোগ দীর্ঘদিনের শরীরবৃত্তীয় ক্ষয়ের ফলে হতে পারে, কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রধানত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার ফল। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ কেবল হাড়ের সংযোগস্থলেই নয়, বরং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি, ফুসফুসে পানি জমা বা শ্বাসকষ্ট, হৃৎপিণ্ডের আবরণে প্রদাহ এবং এমনকি স্থায়ী দৃষ্টিশক্তিহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়। শিশুদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিতে এই রোগটি বর্তমানে অন্যতম প্রধান একটি নীরব ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত।

শিশুরা কেন বাতরোগে আক্রান্ত হয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সত্ত্বেও শিশুদের বাতরোগের সঠিক কারণ এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা। গবেষকরা মনে করেন, এটি একটি ‘অটো-ইমিউন’ সমস্যা। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেখানে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ে, সেখানে এক্ষেত্রে তা পথ হারিয়ে নিজের সুস্থ কোশ বা কলার ওপর আক্রমণ করে বসে। একে ‘অটোগ্রাফ বনাম হোস্ট’ প্রতিক্রিয়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

বাতরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে তিনটি মূল প্রভাবক কাজ করে:
১. বংশগতি: যদি পরিবারের নিকটাত্মীয় বা বাবা-মায়ের বাতরোগ থাকে, তবে শিশুটি প্রাকৃতিকভাবেই ঝুঁকিতে থাকে।
২. পরিবেশ: অত্যাধিক বায়ুদূষণ বা পরিবেশে থাকা টক্সিন ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করতে পারে।
৩. ভাইরাল ইনফেকশন: কিছু নির্দিষ্ট ভাইরাস বা জীবাণুর সংক্রমণের পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও বাতরোগের সূচনা হতে পারে।

যারা রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে

পরিসংখ্যান বলছে, মেয়ে শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সংবেদনশীল। এর পাশাপাশি পরিবারের কেউ যদি টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের মতো অটো-ইমিউন রোগে ভোগেন, তবে সেই পরিবারের শিশুদের সতর্ক রাখা জরুরি। বর্তমানে পরোক্ষ ধূমপান (Secondhand smoke) বা পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের ধূমপানের প্রভাবে শিশুদের শরীরের ইমিউন প্রতিক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে বাতরোগের সূচনা ঘটাচ্ছে। এছাড়াও শিশুদের অস্বাভাবিক স্থূলতা বা শরীরের অতিরিক্ত ওজন হাড়ের গিঁটে চাপ বাড়িয়ে রোগকে ত্বরান্বিত করছে।

অভিভাবকরা যেভাবে চিহ্নিত করবেন: সতর্ক লক্ষণসমূহ

শিশুরা অনেক সময় ব্যথার কথা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলতে পারে না। ফলে রোগের প্রারম্ভিক লক্ষণগুলো অলক্ষিত থেকে যায়। অভিভাবকদের নিচের লক্ষণগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা জরুরি:

  • সকালবেলা হাড়ের জড়তা: যদি দেখা যায় ঘুম থেকে ওঠার পর শিশু পা সোজা করতে পারছে না বা হাতের আঙ্গুল নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে, তবে এটি বাতরোগের অন্যতম প্রধান সংকেত। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মর্নিং স্টিফনেস’ বলা হয়।
  • হাঁটার ধরন পরিবর্তন: যদি হঠাৎ দেখা যায় শিশু খুঁড়িয়ে হাঁটছে বা কোনো শারীরিক কারণ ছাড়াই সে চলাফেরায় অস্বস্তি বোধ করছে।
  • দীর্ঘমেয়াদি জ্বর ও অবসাদ: কোনো বিশেষ অসুখ ছাড়াই অনেক দিন ধরে অল্প অল্প জ্বর এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি।
  • ক্ষুধামন্দা ও ওজন হ্রাস: খাবারের রুচি চলে যাওয়া এবং বয়সের তুলনায় শরীরের ওজন কমে যাওয়া বা স্থবির থাকা।
  • অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফোলা: হাত বা পায়ের কোনো বিশেষ জয়েন্ট লাল হয়ে ফুলে যাওয়া এবং স্পর্শ করলে গরম অনুভব হওয়া।

বাতরোগের চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাতরোগ বা আর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এটি সুনিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব। দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (Pediatric Rheumatologist) পরামর্শ নিলে শিশুর স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

১. ঔষধ: ব্যথানাশকের পাশাপাশি রোগের গতি কমাতে এবং ইমিউন সিস্টেম ঠিক করতে বিশেষ ঔষধ দেওয়া হয়।
২. ফিজিক্যাল থেরাপি: বাতের প্রভাবে হাড় শক্ত হওয়া ঠেকাতে নিয়মিত নির্দিষ্ট ব্যায়াম বা থেরাপির প্রয়োজন হয়। এটি হাড়ের সচলতা রক্ষা করে।
৩. চক্ষু পরীক্ষা: বাতরোগ শিশুদের চোখের ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার কোনো প্রাথমিক লক্ষণ থাকে না। তাই নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা বাতরোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক।
৪. নিয়মিত চেকআপ: যেহেতু বাতরোগ হঠাৎ বৃদ্ধি পেতে পারে বা আবার শান্ত হতে পারে, তাই নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরের ইউরিক অ্যাসিড ও প্রদাহের মাত্রা পরীক্ষা করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কোনো হাতুড়ে বা বিকল্প চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট না করে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে সুশৃঙ্খল চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে প্রয়োজনীয় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং পরিমিত ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। মনে রাখতে হবে, অবহেলার ফলে আজ যে শিশুটি সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে, সঠিক চিকিৎসা না পেলে কয়েক বছরের মধ্যে তাকে হয়তো হুইলচেয়ারে সময় কাটাতে হতে পারে। অভিভাবকদের সচেতনতাই শিশুর ভবিষ্যৎ পঙ্গুত্ব ঠেকাতে সক্ষম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন