চিনের সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল!

চিনের সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল: সতর্ক অবস্থানে তাইওয়ান, কড়া নজরদারি অব্যাহত

চিনের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে শুরু হওয়া ‘অস্বাভাবিক’ রদবদল এবং শীর্ষ পর্যায়ের জেনারেলদের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তাইওয়ান। চিনের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে এই অস্থিরতা তৈরি হলেও তাইওয়ান তাদের সতর্কবার্তায় কোনো ছাড় দিচ্ছে না। সোমবার তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু জানিয়েছেন, বেজিংয়ের সামরিক নেতৃত্বের এই পরিবর্তন স্বত্বেও দ্বীপাঞ্চলটির ওপর থাকা নিরাপত্তা হুমকি এখনো অনেক উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং তাইওয়ান কোনোভাবেই নিজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শিথিল করবে না।

গত শনিবার চিন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন) দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি ভাইস-চেয়ারম্যান জেনারেল ঝ্যাং ইউশিয়া এবং অন্য এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধে গুরুতর শৃঙ্খলা ও আইন ভঙ্গের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। চিনের রাজনৈতিক পরিভাষায় এই ধরনের অভিযোগ সাধারণত দুর্নীতি বা অবিশ্বস্ততার ইঙ্গিত দেয়।


সোমবার দেশটির পার্লামেন্টে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বলেন, “আমরা চিনের কমিউনিস্ট পার্টি, সরকার এবং বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে চলমান এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমাদের সামরিক অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। কারণ বেজিং কখনো তাইওয়ানের ওপর সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিকল্প ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেনি।”

জেনারেল ঝ্যাং ইউশিয়াকে শি জিনপিংয়ের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য সামরিক মিত্র হিসেবে মনে করা হতো। তিনি চিনের সেই হাতেগোনা কর্মকর্তাদের একজন যাদের প্রকৃত রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সাথে সীমান্ত সংঘর্ষে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল। শি জিনপিংয়ের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ইউশিয়া ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এক স্তম্ভ। তাঁর এই নাটকীয় পতন বা তদন্তাধীন হওয়ার বিষয়টি তাইওয়ান ও পশ্চিমের গোয়েন্দাদের কাছে এক বিশাল ধাঁধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী কু জোর দিয়ে বলেন, কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপসরণ বা নেতৃত্বের পরিবর্তন দেখে তাইওয়ান কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে না। তিনি উল্লেখ করেন যে, চিনের ভূখণ্ডগত হুমকি কেবল ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় কৌশলগত লক্ষ্য। তাই চিনের এই রদবদলকে ঘিরে তাইওয়ানের আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই।


তাইওয়ানের আকাশসীমা এবং সামুদ্রিক অঞ্চলে চিন প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে। তাইপেই একে বেইজিংয়ের এক ‘দীর্ঘমেয়াদি হয়রানিমূলক কর্মসূচি’ হিসেবে দেখছে, যার লক্ষ্য হলো তাইওয়ান সরকারকে চিনের সার্বভৌমত্বের দাবি মানতে বাধ্য করা। ওয়েলিংটন কু তাঁর বক্তব্যে জানান, তাইওয়ান চিনের সামরিক উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য অভিসন্ধি বোঝার জন্য এখন অত্যাধুনিক সমন্বিত গোয়েন্দা ব্যবস্থা, শক্তিশালী নজরদারি এবং পুনর্নিরীক্ষণ (Reconnaissance) পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এছাড়া তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক অংশীদার বা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে।

সম্প্রতি চিনের প্রতিরক্ষা বাজেট ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্কবার্তা দেন যে, পরিস্থিতি দিন দিন জটিলতর হচ্ছে। গত মাসেই চিন তাইওয়ানকে চারপাশ থেকে ঘিরে এক বিশাল সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছিল। বেইজিংয়ের সেই রণমূর্তি এখনো প্রশমিত হয়নি। কু সাফ জানিয়ে দেন, “কোনো নির্দিষ্ট একজনের পতনের কারণে আমরা আমাদের প্রস্তুতি লেভেল বা ওয়ার-রেডিনেস লেভেলে কোনো শিথিলতা আনব না।”


পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, তাইওয়ানকে এখন কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয় বরং অসামরিক ও প্রযুক্তিগত সংকেতগুলোর ওপরও লক্ষ্য রাখতে হবে। চিনের কমান্ড কাঠামোতে কোনো ছোট রদবদল যাতে চোখ এড়িয়ে না যায় সেদিকে সার্বক্ষণিক সজাগ থাকা প্রয়োজন। এটি মূলত এক ধরনের আগাম সতর্ক সংকেত বা ‘আর্লি-ওয়ার্নিং ইন্ডিকেটর’ শনাক্ত করার কৌশল। চিনের সামরিক কমিশনের অভ্যন্তরীণ সংকট কিংবা কর্মকর্তাদের পরিবর্তন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা—তা বিচার করেই তাইওয়ান তাদের পরবর্তী প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বিগত কয়েক বছরে শি জিনপিং তাঁর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে রকেট ফোর্স থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগের একাধিক জেনারেলকে পদচ্যুত করেছেন। ঝ্যাং ইউশিয়ার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়া তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পিএলএ-র (পিপলস লিবারেশন আর্মি) অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান বা ক্ষমতার লড়াই এখন চরমে।

এদিকে বেইজিংয়ের দাবি অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক উপায়ে শাসিত তাইওয়ান চিনের নিজস্ব ভূখণ্ড। বিপরীতে তাইওয়ান সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ কেবল তার দুই কোটি ৩০ লক্ষ জনগণই নির্ধারণ করবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক অস্থিরতার মাঝে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই ‘হাই-অ্যালার্ট’ বার্তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চিনের অন্দরমহলের অস্থিরতা দক্ষিণ চিন সাগরে নতুন কোনো যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপের পূর্বাবাস কিনা, তা নিয়েই এখন বিশ্ব নেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে। আপাতত ‘বাংলা রয়টার্স’ পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন