নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর আবারও ‘ডিম হামলা’

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর আবারও ‘ডিম হামলা’: তারেক রহমান ও মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনসিপির

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরে অবস্থিত হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে একটি পিঠা উৎসবে যোগ দিতে গিয়ে তিনি ডিম হামলার শিকার হন। এ ঘটনার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সরাসরি দায়ী করেছে এনসিপি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সংগঠন এনসিপি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটে রয়েছে। এই জোটের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে প্রচার চালাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।


এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম জানান, আজ দুপুরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ প্রশাসন আয়োজিত পিঠা উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিতে যান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তবে তিনি কলেজ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথেই পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একদল ব্যক্তি ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে তাকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর অনুসারীদের নিয়ে কলেজের একটি ভবনের বারান্দায় আশ্রয় নেন।

সেখানে অবস্থানকালেও উত্তেজিত ব্যক্তিরা তাঁকে লক্ষ্য করে অনবরত ডিম নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এনসিপির কর্মীরা পাল্টা স্লোগান (নারায়ে তাকবির) দিলেও হামলাকারীরা নিবৃত্ত হয়নি। ঘটনার শেষ পর্যায়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কলেজ থেকে বের হয়ে প্রতিবাদস্বরূপ সামনের রাস্তায় বসে পড়েন। এ সময় ওই এলাকায় যানচলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং তীব্র উত্তজনা ছড়িয়ে পড়ে।


হামলার ঘটনার পর দুপুর ২টার দিকে ফকিরাপুল মোড়ে এনসিপির নির্বাচনী কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আঙ্গুল তোলেন। তিনি বলেন, “হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে মির্জা আব্বাসের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এই হামলা করেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, তারেক রহমানের সম্মতিতে মির্জা আব্বাসের নির্দেশেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর পরিকল্পিত এই হামলা হয়েছে। একদিকে আপনারা মঞ্চে উঠে গণতন্ত্রের বড় বড় বুলি আওড়াবেন, অন্যদিকে রাজপথে বিরোধীদের সন্ত্রাসী কায়দায় দমনের চেষ্টা করবেন—এটি জনগণ মেনে নেবে না।”

নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি কৌশলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছে। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “এমন অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন, কলেজ প্রশাসন এবং বিএনপির দলীয় হাই-কমান্ডের কাছে আমরা এই বর্বরোচিত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। এর যোগ্য জবাব আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বক্সের মাধ্যমে জনগণ দেবে।”

স্বয়ং প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেছেন, হামলাকারীরা মূলত ‘ছাত্রদলের’ ব্যানারে এই কাজ করেছে। তিনি দাবি করেন, এরা সাধারণ শিক্ষার্থী নয় বরং মির্জা আব্বাসের বিশেষ নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। আজকের এই হামলায় অন্তত ১২ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।


পুরো ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাহাৎ খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ শুরু থেকেই সেখানে ছিল এবং জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটকের খবর পাওয়া যায়নি।


উল্লেখযোগ্য যে, এর আগেও গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সিদ্ধেশ্বরী গোল্ডেন প্লাজা এলাকায় গণসংযোগের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ময়লা পানি ও ডিম ছুড়ে মারা হয়েছিল। ওই সময়ে তিনি এই ঘটনার জন্য এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজদের দায়ী করেছিলেন। তবে তিন দিনের মাথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে একই ধরনের লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির শিকার হওয়ার পর এনসিপির নেতারা আর এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করছেন না। তাদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবেই এই ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকা-৮ আসনটি বরাবরের মতোই ভিভিআইপি ও মর্যাদাপূর্ণ। এখানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিপরীতে অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতীক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের আবেগ ও পুরনো শক্তির প্রভাবের এই লড়াই নির্বাচনী ময়দানকে দিন দিন মেরুকরণ করছে। আজকের হামলার ঘটনায় এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক এবং গুঞ্জন লক্ষ্য করা গেছে।


এনসিপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট এই হামলার ঘটনাকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোটের নেতারা মনে করছেন, প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হলে তা নির্বাচনী স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সংবাদ সম্মেলন শেষে নাহিদ ইসলাম পরিষ্কার করেছেন, এনসিপি কোনো ভয়ভীতির মুখে রাজপথ ছেড়ে দেবে না। আগাম নির্বাচন তথা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের দিন পর্যন্ত তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন।

বর্তমানে ওই নির্বাচনী এলাকায় পুলিশের বাড়তি টহল মোতায়েন করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই আলোচনা—ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আর পেশিশক্তির প্রভাবে সাধারণ ভোটাররা আদৌ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন কি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন