কী ঘটেছিল কল্যাণপুরের সেই ‘জাহাজ বাড়িতে’?

কল্যাণপুরে ৯ তরুণকে হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ: শেখ হাসিনাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালে রাজধানীর কল্যাণপুরে ‘জাহাজ বাড়িতে’ তথাকথিত জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ৯ তরুণকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন পক্ষ। এই মামলায় সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের তৎকালীন শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম আজ গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রসিকিউশনের দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণাদি সহ ফরমাল চার্জ জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেদিন কোনো প্রকৃত জঙ্গি বিরোধী অভিযান নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে নিরপরাধ তরুণদের তুলে নিয়ে নাটকীয় অভিযানের নামে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ সংগঠিত করা হয়েছিল।


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত এই অভিযোগপত্রে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রসিকিউশনের দাবি, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এমন বিচারবহির্ভূত হত্যার ‘সিস্টেমেটিক’ নির্দেশ ও মদদ দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ছাড়াও মামলার অপর গুরুত্বপূর্ণ সাত আসামি হলেন—
১. আসাদুজ্জামান খান কামাল (তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
২. এ কে এম শহিদুল হক (তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক বা আইজিপি)
৩. আছাদুজ্জামান মিয়া (ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার)
৪. মনিরul ইসলাম (তৎকালীন ডিবির প্রধান ও পরবর্তীতেএসবির প্রধান)
৫. আব্দুল্লাহ আল মামুন (তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি)
সহ আরও তিন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিরা তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একটি খুনি বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন এবং ভিন্নমত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ‘জঙ্গি দমনের’ ধোয়া তুলে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন।


ঘটনাটি ছিল ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই ভোরের। ঢাকার কল্যাণপুর ৫ নম্বর রোডে অবস্থিত ৫৩ নম্বর বাড়িতে (যা এলাকায় জাহাজ বাড়ি নামে পরিচিত ছিল) তৎকালীন আইন-শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ পরিচালনা করে। পুলিশের পক্ষ থেকে সেই সময় জানানো হয়েছিল যে, তারা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৯ জঙ্গিকে গুলি করে হত্যা করেছে এবং একজন পালিয়ে গেছে ও অন্যজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়েছে।

তৎকালীন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গিয়েছিল, তরুণদের গায়ে বিশেষ কালো পোশাক ছিল এবং ঘটনাস্থলে জঙ্গি আস্তানা বলে দাবি করার মতো কিছু প্রমাণ সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, জাহাজ বাড়ির ওই অপারেশনটি ছিল একটি ‘ সাজানো নাটক’। মূলত পুলিশ ওই তরুণদের আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে নিখোঁজ বা গ্রেফতার করেছিল এবং পরবর্তীতে এই বাড়িতে নিয়ে এসে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে পুরো বিষয়টি জঙ্গি অভিযানের মোড়ক দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তামীম আজ দাবি করেছেন, তারা তদন্তে এমন প্রমাণ পেয়েছেন যা নির্দেশ করে যে, ৯ জন তরুণের প্রত্যেকের মৌলিক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে এবং তাদের কোনো ধরনের আইনি লড়াইয়ের সুযোগ না দিয়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করা হয়েছে।


প্রসিকিউটরদের মতে, কোনো নিরস্ত্র জনগোষ্ঠী বা নিরস্ত্র ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ আওতায় পড়ে। ২০১৬ সালের সেই হত্যাকাণ্ড কেবল একক কোনো ঘটনা ছিল না, বরং তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়া এবং জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জনের একটি ভয়াবহ কৌশল ছিল। জাহাজ বাড়ির সেই দৃশ্যমান জরাজীর্ণ এবং পরিত্যক্ত আবহে ৯টি তরুণের লাশ স্তূপ করে রাখার যে ট্র্যাজেডি তা আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার এক কলঙ্কজনক উদাহরণ।

আইসিটির বর্তমান প্রসিকিউশন মনে করছে, তৎকালীন সরকারের তৎকালীন প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এই ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের’ চূড়ান্ত দায় এড়াতে পারেন না। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের প্রধান নির্দেশক হিসেবে আছাদুজ্জামান মিয়া ও মনিরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও অকাট্য প্রমাণের দাবি করা হয়েছে চার্জশিটে। বিশেষ করে মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ডিএমপির বিশেষ সেল যে উপায়ে জঙ্গি নাটকের কাহিনী সাজিয়েছিল, তার সব নথিপত্র বর্তমানে তদন্ত সংস্থার হস্তগত হয়েছে।


আজ ফরমাল চার্জ দাখিলের মাধ্যমে কল্যাণপুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দ্বার আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযোগগুলো আমলযোগ্য কিনা তা বিচার করে দেখবেন। অভিযোগ আমলে নেওয়া হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। শেখ হাসিনাসহ অনেক আসামি বর্তমানে বিদেশে পালিয়ে আছেন, যা বিচারের ক্ষেত্রে ‘অনুপস্থিতি বা ইন-অ্যাবসেনশিয়া’ বিচার প্রথা কার্যকরের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে।

তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা কেবল এই ৯ জন নয়, জাহাজ বাড়ি থেকে প্রাণে বেঁচে আসা সেই সময়কার আটক তরুণদের সাক্ষী হিসেবে আদালতে পেশ করবেন, যাদের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে রিমান্ডে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল বলে বর্তমানে অভিযোগ উঠেছে। এই ঐতিহাসিক মামলার শুনানি আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হতে পারে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা এই অভিযোগ দাখিলকে ‘বিচারের ক্ষেত্রে এক বিশাল অগ্রগতি’ হিসেবে দেখছেন। ১৬ বছর ধরে চলে আসা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিখোঁজ হওয়া এবং কথিত ক্রসফায়ার কালচারের বিচারের পথে এই মামলাটি একটি দৃষ্টান্তমূলক নজির হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন