‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি, আপনাদের হাতেই সঁপে দিলাম’: তারেক রহমান

‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি, আপনাদের হাতেই সঁপে দিলাম’: সদরের নির্বাচনী মতবিনিময়ে তারেক রহমান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর পৈতৃক ও রাজনৈতিক শক্তির উৎসভূমি বগুড়াকে দলের ‘অভেদ্য ঘাঁটি’ হিসেবে অভিহিত করে এর সামগ্রিক দায়িত্ব স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে সঁপে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তাঁকে সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকতে হবে, তাই তাঁর নিজ আসন বগুড়া-৬ (সদর)-সহ জেলার সকল আসনের জয় নিশ্চিত করার গুরুভার এখন স্থানীয় নেতৃত্বের কাঁধে।

আজ শনিবার বেলা ১১টায় বগুড়ার উপশহর এলাকায় অবস্থিত চার তারকা হোটেল নাজ গার্ডেনের বলরুমে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নিজের নির্বাচনী এলাকা বগুড়া-৬ (সদর) আসনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা।


বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান বগুড়ার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। উপস্থিত নেতাকর্মীদের আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বগুড়া বিএনপির অজেয় ঘাঁটি। এই মাটি ও মানুষের সঙ্গে শহীদ জিয়ার আদর্শ মিশে আছে। আজ আপনাদের এই বলরুমে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার এই প্রিয় ঘাঁটির দায়িত্ব আপনাদের হাতেই সঁপে দিয়ে গেলাম। এই জনপদ এবং এখানকার জনগণকে আপনারাই আগলে রাখবেন। এটি আমার নয়, আপনাদেরও অস্তিত্বের লড়াই।”

সকাল সাড়ে ১০টায় সভা শুরু হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা ও নির্বাচনী কৌশলের কথা ধৈর্য সহকারে শোনেন তারেক রহমান। এরপর তিনি তাঁর দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ শুরু করেন।


সভার শুরুতে কয়েকজন স্থানীয় নেতা তাঁদের বক্তব্যে দাবি করেন যে, বগুড়ায় বিএনপির জয় এতটাই নিশ্চিত যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে না গেলেও ‘ধানের শীষ’ বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হবে। কিন্তু দলীয় চেয়ারম্যান এই ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন।

তারেক রহমান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “কেউ কেউ বলছেন ভোটারের কাছে না গেলেও আমরা জিতব। আমি আপনাদের সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। এবারের নির্বাচন কেবল একটি আসন বা একটি জয় নয়, এটি গণতন্ত্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠার লড়াই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এবারের প্রতিটি ভোট অত্যন্ত মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা কেউ ঘরে বসে থাকবেন না। জয় আমাদের সুনিশ্চিত, কিন্তু সেটি প্রমাণ করতে হলে প্রত্যেক ভোটারের আঙিনায় পৌঁছাতে হবে। ধানের শীষের যে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাকে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে হবে। কেবল জয় নয়, বগুড়ার সাতটি আসনেই এমন বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হতে হবে, যা ইতিহাসে উদাহরণ হয়ে থাকে।”


নিজে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিলেও নিজের নির্বাচনী কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা করতে পারবেন না বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “অতীতের সব কঠিন সময়ে আমি আপনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। এবার আমি নিজেই সদর আসনে আপনাদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের প্রত্যেকটি আসনে ধানের শীষের হয়ে জনসভা করতে আমাকে ছুটতে হচ্ছে। এক জায়গায় স্থির থাকার সুযোগ আমার নেই। ফলে আমার নিজের নির্বাচন করার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব আমি আপনাদের কাছে রেখে গেলাম।”

নেতাকর্মীদের তিনি এই নিশ্চয়তা দেন যে, কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বগুড়া সবসময় অগ্রাধিকার পাবে।


মতবিনিময় সভাটি সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ-উন-নবী ও খায়রুল বাশার। সভায় তারেক রহমানের উপজাতীয় ও স্থানীয় উপদেষ্টারা ছাড়াও জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এ কে এম মাহবুবুর রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বগুড়া-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার।

আরও উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন এবং আলী আজগর তালুকদার। এছাড়া শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খানসহ ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রায় সহস্রাধিক নেতা সভায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।


বগুড়ায় তারেক রহমানের এই মতবিনিময় সভার পর তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, চেয়ারম্যানের নিজের আসন হওয়ার কারণে সদর আসনে ভোট কেবল প্রতীকী নয়, এটি দেশব্যাপী একটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। সভা শেষে নেতাকর্মীরা সড়কপথে বের হয়ে মিছিল ও স্লোগান দিয়ে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তারেক রহমান যে ‘বসে থাকলে চলবে না’ মর্মে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সেটি মূলত দলীয় অভ্যন্তরের আলস্য দূর করার এক সময়োপযোগী বার্তা। নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে বগুড়ার এই শক্তি প্রদর্শনী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বগুড়া থেকে পাঠানো বার্তায় তারেক রহমান এটিই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বিএনপির দুর্গ পুনরুদ্ধার ও সংহতকরণে তিনি বিন্দুমাত্র আপস করতে রাজি নন।

মতবিনিময় সভা শেষে তারেক রহমান বগুড়া জেলার সাতটি নির্বাচনী এলাকার সমন্বয়কারীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন এবং পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা ও ভোটের দিনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা নির্দেশনা প্রদান করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন