মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা ও চর্তুদর্শী উত্তজনা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা ও চর্তুদর্শী উত্তজনা: ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিল যুক্তরাষ্ট্র


পারস্য উপসাগর ও লেভান্ট অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে র দুই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কাছে কয়েক শত কোটি ডলারের আধুনিক মারণাস্ত্র বিক্রির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) পৃথক দুটি বিবৃতিতে এই বিশাল সমরাস্ত্র চুক্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপকে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এক নতুন মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।


মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, তারা ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সমরাস্ত্র বিক্রির সবুজ সংকেত দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ইসরায়েল পাবে ৩০টি অত্যাধুনিক ‘অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার’। এই হেলিকপ্টারগুলো যেকোনো বৈরী পরিবেশে নিখুঁতভাবে ট্যাংক ও লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারদর্শী, যা ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সক্ষমতাকে আরও শাণিত করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসরায়েলকে একটি শক্তিশালী এবং সদাপ্রস্তুত আত্মরক্ষা সক্ষমতা তৈরি ও বজায় রাখতে সহায়তা করা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অস্ত্র বিক্রি আমাদের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ১৮০ কোটি ডলার মূল্যের ‘জয়েন্ট লাইট ট্যাকটিক্যাল ভেহিকল’ বা আধুনিক হালকা সাঁজোয়া সামরিক যানও ইসরায়েলকে সরবরাহ করা হবে। উল্লেখ্য যে, প্রতিবছরই ইসরায়েলকে বড় অংকের সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র, তবে এবারের এই প্রস্তাবিত বিক্রি কেবল সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আধুনিকায়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে।


একই সময়ে রিয়াদের সামরিক সামর্থ্য নিশ্চিতে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। আকাশপথে সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় সৌদি আরবের জন্য ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ৭৩০টি ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই প্যাট্রিয়ট মিসাইল বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি। ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল কিংবা ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে সৌদি আরবের মতো তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মনে করছে হোয়াইট হাউস।


যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েল ও সৌদি আরবে এই বিশাল পরিমাণ অস্ত্র প্রবাহ মূলত ইরানের সঙ্গে বর্তমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই করা হয়েছে। বিগত এক বছরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েল বড় ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করেছিল, যার প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি বারেবারে দিয়ে আসছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান ও তার ছায়া গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য গতিবিধি রুখতে মার্কিন নৌবাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের অতি নিকটবর্তী জলসীমায় তাদের বিশাল রণতরী বহর মোতায়েন করে রেখেছে।

ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু যেখানে ইরান, সেখানে সৌদি আরব কিছুটা কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরান সৌদি আরবের কৌশলগত মিত্র না হলেও রিয়াদ চায় না তেহরানের ওপর সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধ হোক। সৌদি নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, পারস্য উপসাগরে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অস্থিরতা তৈরি হলে তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ও রূপকল্প ২০৩০-এর মাধ্যমে গড়া উজ্জ্বল বৈশ্বিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


এদিকে গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের অতর্কিত হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। হামাসের সেই হামলায় অন্তত ১ হাজার ২২১ জন নিহত হয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা প্রতিশোধমূলক অভিযান এখনো বিদ্যমান। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ৬৬৭ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

গাজার এই চরম মানবিক সংকট ও সামরিক আগ্রাসনের ফলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যকার সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ (Normalization) প্রক্রিয়াটি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় একটি গাজা যুদ্ধবিরতি এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে মূলত হামাসকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রিয়াদ পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের দিকে অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক হাত মেলানো সম্ভব নয়।


বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসরায়েল ও সৌদি আরব—উভয়কেই সমরাস্ত্রে সজ্জিত করে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি ছায়া প্রতিরোধ (Deterrence) গড়ে তুলতে চাচ্ছে। এর মাধ্যমে ইরানকে এটিই পরিষ্কার করা হয়েছে যে, তেহরান যদি এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বা কোনো প্রত্যক্ষ হামলার পথে হাঁটে, তবে আমেরিকা সরাসরি ও তার শক্তিশালী মিত্রদের মাধ্যমে কঠোর জবাব দিতে পিছপা হবে না। সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা মজবুত করা এবং ইসরায়েলকে আক্রমণাত্মক শক্তিতে সাবলম্বী করা ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির এক বিশাল চাঞ্চল্যকর অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন