বর্তমান ঢালিউডে ‘চেনা পথে না হাঁটা’ এবং ‘কাজের মানের ওপর ছাড় না দেওয়া’—এই নীতিকে উপজীব্য করে নিজের ক্যারিয়ারের রেখাচিত্র সাজাচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ। বছরে হাফ ডজন সিনেমার গড্ডলিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে তিনি এখন সংখ্যার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন মনোরম ও দুর্গম লোকেশনে চলছে তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘রাক্ষস’-এর দৃশ্যধারণ। সেখানে নিজেকে অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে বা রহস্যের আড়ালে রাখলেও সিয়াম আহমেদ এবার ভক্তদের সামনে নিয়ে এলেন সিনেমার অন্যতম প্রধান আকর্ষণকে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টালিউড অভিনেত্রী সুস্মিতা চ্যাটার্জির একটি গানের দৃশ্যের ছবি প্রকাশ করে ঢালিউড পাড়ায় নতুন এক জল্পনার জন্ম দিয়েছেন।
গত বছর ‘জংলি’ সিনেমার মাধ্যমে সিয়াম আহমেদ প্রমান করেছেন যে, কেবল একটি নিখুঁত ‘লুক’ কীভাবে সিনেমার প্রতি দর্শকের তুমুল কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারে। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই ‘রাক্ষস’ সিনেমার জন্য শুরু থেকেই সাবধানী সিয়াম। তিনি চাচ্ছেন না এখন তাঁর নতুন রূপ কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যাক। ভক্তদের মধ্যে এই লুক ঘিরে যে ব্যাপক জল্পনা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে, তাকে এক প্রকার দীর্ঘায়িত করার কৌশলী পথে হাঁটছেন এই অভিনেতা।
শ্রীলঙ্কা থেকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিয়াম আহমেদ ‘বাংলা রয়টার্স’ এবং দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোকে বলেন, “দর্শকের আগ্রহ বজায় রাখা আমাদের সিনেমার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। অনেক ভক্তই প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় বা বিভিন্ন মুভি গ্রুপে আমার বর্তমান রূপ দেখতে চান। তবে এখনই নিজেকে পুরোপুরি উন্মোচন করছি না। সে জায়গায় একটু ভিন্ন চমক দিতেই আমরা নায়িকা সুস্মিতার লুকটি প্রকাশ্যে এনেছি। শ্রীলঙ্কার এই দৃশ্যটি মূলত একটি গানের অংশ, যা আমরা পূর্ণ একাগ্রতার সঙ্গে ধারণ করেছি।” সিয়ামের মতে, সিনেমার আসল চমক থাকবে টিজার, ট্রেলার এবং চূড়ান্ত পোস্টারে।
শুটিং ইউনিটের বর্তমান ব্যস্ততা এবং সিনেমার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সিয়াম আহমেদ জানান যে, এরই মধ্যে চলচ্চিত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বাজারে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমার সাথে পাল্লা দিতে হলে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সিয়ামের ভাষ্যমতে, “শ্রীলঙ্কায় আমরা দিনের বেলা ঝকঝকে রোদে এবং গভীর রাতে নিস্তব্ধ অন্ধকারে সমানে শুটিং চালিয়ে যাচ্ছি। এমন অনেক সিক্যুয়েন্স আছে যা চাইলে আমরা কাটছাঁট করতে পারতাম বা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু গল্পের প্রয়োজনে আমরা তার সিকিভাগও ছাড় দিচ্ছি না। দর্শক যখন বড় পর্দায় ‘রাক্ষস’ দেখবেন, তখন বুঝতে পারবেন আমরা কতটা বৈচিত্র্য এবং ভিন্নধর্মী উপাদানের সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি।”
সিনেমা সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, চিত্রনায়িকা সুস্মিতা চ্যাটার্জির সঙ্গে সিয়ামের অন-স্ক্রিন রসায়ন পর্দায় নতুন রঙ চড়াবে। টালিউডের এই অভিনেত্রীকে কেন নেওয়া হলো—সে প্রসঙ্গে টিম ‘রাক্ষস’-এর ভাষ্য ছিল একটাই—তাঁদের গল্পের প্রয়োজনে একজন নতুন মুখ এবং স্ক্রিন পার্সোন্যালিটি দরকার ছিল, যা সুস্মিতার মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান।
চলচ্চিত্রটির পরিচালক মেহেদী হাসান সিয়াম ভক্তদের এক ভিন্ন ধরনের স্বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সিনেমার নামকরণের সাথে এর গল্পের যে যোগসূত্র, তা ফুটে উঠবে ‘রাক্ষস’-এর পরতে পরতে। মেহেদী হাসান জানালেন, “এটি কোনো প্রচলিত ধারার প্রেমের বা সামাজিক সিনেমা নয়। বরং এটি অপরাধ জগতের অন্ধকার দিক এবং তীব্র ‘রাফ ন্যারেটিভ’ বা কঠোর বর্ণন শৈলীর মিশেলে তৈরি একটি ভিন্ন মাত্রার সিনেমা। বাংলাদেশের দর্শকরা বড় পর্দায় এই পরিমাণ ভায়োলেন্স বা ‘অন্ধকার জগতের’ সূক্ষ্ম কাজ আগে খুব একটা দেখেননি বললেই চলে। আমরা চেষ্টা করছি দর্শককে শিহরিত করতে।”
উল্লেখ্য যে, ‘রাক্ষস’ সিনেমাটির পেছনে কাজ করছে ‘রিয়েল এনার্জি কমিউনিকেশন’। এর আগে এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানের ব্লকবাস্টার হিসেবে খ্যাত ‘বরবাদ’ সিনেমাটি উপহার দিয়েছিল। তাই স্বভাবতই দর্শকদের উচ্চাশা অনেক বেশি। প্রযোজনা সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন যে, বাজেটের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে একটি নিখুঁত চিত্রনাট্য বড় পর্দায় ফোটানোর লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কা ও দেশের ভেতরের বড় একটি অংশ বেছে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় বাংলার এই মেলবন্ধন নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি আগামি পবিত্র ঈদুল ফিতর বা ঈদ-উল-ফিতরে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ চালাচ্ছে। সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই বর্তমানে প্রতিদিন ধারণকৃত ফুটেজ বা ডিআই প্যাক সরাসরি চলে যাচ্ছে সম্পাদনার টেবিলে। কালার গ্রেডিং থেকে শুরু করে ডাবিংয়ের প্রস্তুতি—সবই সমান্তরালভাবে চলছে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিনেমার পুরো টিম আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। এরপর ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাকি অংশের দৃশ্যধারণ করা হবে এবং ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই সকল ক্যামেরা বন্ধ করার বা ‘প্যাক আপ’-এর পরিকল্পনা রয়েছে। তার ঠিক পরপরই পবিত্র রমজান মাসের শুরু থেকে টিজার ও প্রচারণামূলক প্রচারণা শুরু হবে।
সব মিলিয়ে সিয়াম আহমেদ এবার ‘রাক্ষস’-এর মাধ্যমে নতুন এক ইতিহাস গড়তে চান। নিজেকে আড়ালে রেখে যেভাবে রহস্য তৈরি করছেন এবং টালিউড সুন্দরীকে যে ভঙ্গিতে সামনে এনেছেন, তাতে আসন্ন ঈদের বক্স অফিসে ‘রাক্ষস’ যে একটি প্রবল প্রতাপশালী অবস্থান গ্রহণ করবে—তা অনুমেয়।
