দেশের কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এখন থেকে কোনো প্রকার স্থাবর সম্পত্তি বা দলিলপত্র বন্ধক রাখা ছাড়াই অর্থাৎ সম্পূর্ণ জামানতবিহীন ‘শস্য ঋণ’ নিতে পারবেন দেশের কৃষকেরা। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের খামারিদের কথা মাথায় রেখে ৫ একর জমি পর্যন্ত এই ঋণ সুবিধা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সরকারের এমন উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও সংহত করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বর্তমানে দেশের পল্লী জনপদের অর্থায়নে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তাদের মোট বার্ষিক ঋণ বরাদ্দের অন্তত ৬৫ শতাংশই ব্যয় করা হচ্ছে সরাসরি কৃষিঋণ হিসেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম ও ফসল ভিত্তিক নীতিমালার আলোকেই এসব ঋণ বণ্টন করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ কৃষক, বর্গাচাষি এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্যজীবীরা এখন সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা লাভ করছেন।
ফসল ভেদে ঋণের পরিমাণ ও সীমা
শস্য ঋণের ক্ষেত্রে কোনো বাঁধাধরা একক পরিমাণ নেই; বরং এটি নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট ফসলের ধরন ও আবাদের ক্ষেত্রফলের ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট পলিসি বা ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী ৫ একর জমি পর্যন্ত জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা এক বছরের মধ্যে ফসল কাটার পর কৃষকদের পরিশোধ করতে হয়।
সবচেয়ে জনপ্রিয় বোরো ধানের ক্ষেত্রে একজন কৃষক প্রতি একরে ৭৬ হাজার ৭৯০ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারছেন। এই হিসেবে একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৫ একর জমির জন্য ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা জামানতহীন ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে সক্ষম। একইভাবে আলুর ফলন বাড়ানোর লক্ষে প্রতি একরে ৭৫ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে, তবে আলুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আড়াই একর জমিতে এই অর্থায়ন সীমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে আলুর জন্য একজন কৃষক সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
বিস্ময়কর ও অর্থকরী ফসল কলার ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ আরও বেশি। কলা চাষের ব্যাপক উৎপাদন খরচের কথা বিবেচনায় রেখে প্রতি একরে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার ফলে একজন কলার বাণিজ্যিক চাষি সর্বোচ্চ ৫ একরের বিপরীতে ৬ লাখ ৬৯ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত মোটা অঙ্কের শস্য ঋণ পেতে পারেন। তবে কৃষিকাজের চাহিদা ও ফসলের প্রকারভেদে বিভিন্ন ঋণের এই পরিমাণ ব্যাংকভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া: জাতীয় পরিচয়পত্রেই মিলবে সমাধান
বর্তমান সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ব্যাংকিং সেবাকে কৃষকদের দোড়গোড়ায় নিয়ে আসার যে অঙ্গীকার করেছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কৃষি ঋণের আবেদন পদ্ধতিতে। কৃষি ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঋণ গ্রহণের জন্য কৃষকদের পূর্বের মতো স্তূপীকৃত নথিপত্র বহনের প্রয়োজন নেই। ঋণপ্রার্থী কৃষকেরা কেবল তাঁদের ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ (এনআইডি) সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করলে শাখা কর্মকর্তাদের সহায়তায় সহজেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছেন। এমনকি আবেদনের ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যেই দ্রুততর সময়ে ঋণগ্রহীতার হাতে টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। ঋণের এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি গ্রাহককে একটি ‘ক্রেডিট পাসবুক’ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ঋণ ও পরিশোধের বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে।
বর্তমানে এই খাতের ঋণের জন্য সুদের হার ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারিত করা হয়েছে। তবে বাজার ও সময় বিবেচনায় এই হারের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হতে পারে। মূলত প্রকৃত কৃষকেরাই যেন এই ঋণের মালিক হন, সেই বিষয়টি নজরদারি করতে উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও বর্তমান বাজারের প্রতিফলন
কৃষি ব্যাংকের প্রশিক্ষণ অনুষদের সদস্য মুহাম্মদ মাছুদুর রহমান ‘বাংলা রয়টার্স’-কে জানান, “সারা দেশে এখন বোরো ধান, কলা ও আলু আবাদের ওপর কৃষকদের ঝোঁক সবচেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে এসব ফসল অত্যন্ত লাভজনক এবং শস্য ঋণের লভ্যতাও সহজে মিলছে। দেশের যেকোনো ইউনিয়নের কৃষিকাজে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ এখন নিজের বাড়ির কাছে থাকা কৃষি ব্যাংক বা অন্য ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করে আবেদন করতে পারছেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঋণের সহজীকরণ করা হয়েছে বলেই বর্তমান সময়ে শস্য বিমা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাতেও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ও বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য মোট ৩৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করে আমদানি নির্ভরতা কমানোই এর মূল উদ্দেশ্য। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সারা দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ১১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, মোট বিতরিত ঋণের সিংহভাগ অর্থাৎ ৪৭ শতাংশই সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে শস্য আবাদ খাতে। এ ছাড়াও পশুপালন ও পোলট্রি শিল্পে ২৭ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। মৎস্যচাষ, কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়, ক্ষুদ্র সেচ ও দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পগুলোতে বাকি ঋণ প্রদান করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি মহাজনদের উচ্চ সুদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে দেশের ৩ কোটিরও বেশি কৃষিশ্রমিক ও প্রান্তিক চাষিকে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ছাতার নিচে আনা একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। যদি প্রতিটি যোগ্য কৃষক নির্ধারিত সময়ে সঠিক পরিমাণে শস্য ঋণ পান, তবে দেশের চাল, পেঁয়াজ, সবজি ও তৈলবীজ উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের টালমাটাল অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় ‘গ্রিন এগ্রিকালচার’ বা টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় ঋণের প্রবাহ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। কৃষি ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্গাচাষিদের জন্য পৃথক কার্ড প্রদান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ সুযোগ থাকছে। এর ফলে গ্রামগঞ্জের অভাবী চিত্র ঘুচিয়ে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী কৃষি সমাজ গঠনের পথ আরও প্রশস্ত হচ্ছে।
