ব্রিটিশ রাজপরিবারে যৌন নিগ্রহের কলঙ্ক যেন কিছুতেই কাটছে না। ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই এবং বর্তমানে খেতাব হারানো অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের বিরুদ্ধে নতুন করে আরও এক নারী যৌন লালসার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। নতুন এই অভিযোগ অনুযায়ী, কুখ্যাত মার্কিন অর্থকুবের এবং দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সরাসরি ওই নারীকে লন্ডনে অ্যান্ড্রুর কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁকে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ফের রাজপরিবারের মর্যাদা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সংবাদ সংস্থা বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্র্যাড এডওয়ার্ডস তাঁর মক্কেলের পক্ষে এই নতুন আইনি লড়াই শুরু করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই ব্র্যাড এডওয়ার্ডস ইতিপূর্বে জেফরি এপস্টেইনের দ্বারা নিগৃহীত ২০০ জনেরও বেশি নারীর হয়ে লড়াই করেছেন। নতুন অভিযোগকারী নারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১০ সালে উইন্ডসর এস্টেটে অবস্থিত অ্যান্ড্রুর সরকারি বাসভবন ‘রয়েল লজ’-এ। ঘটনার সময় ওই অভিযোগকারী তরুণীর বয়স ছিল কুড়ির কোঠায় এবং তিনি ব্রিটিশ নাগরিক নন।
যৌন সম্পর্ক এবং বাকিংহাম প্যালেসের চা-আপ্যায়ন: রহস্যের নতুন মোড়
আইনজীবী এডওয়ার্ডস ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছেন তা কেবল কলঙ্কজনকই নয় বরং নজিরবিহীনও বটে। তাঁর ভাষ্যমতে, “জেফরি এপস্টেইন সুপরিকল্পিতভাবে ওই নারীকে যুক্তরাজ্যে অ্যান্ড্রুর জন্য পাঠিয়েছিলেন। অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এক রাত কাটানোর পর ওই নারীকে অদ্ভুত এক পুরষ্কার দেওয়া হয়। রাজপরিবারের নিরাপত্তার বেষ্টনী টপকে তাঁকে খোদ বাকিংহাম প্যালেস ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিল এবং সেখানে প্রথাগত রাজকীয় মর্যাদায় চা-আপ্যায়ন করা হয়েছিল।”
বিশ্লেষকদের মতে, একজন সাধারণ বিদেশি নাগরিক কীভাবে প্রোটোকল ভেঙে প্যালেসের অন্দরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর মেহমানদারির জন্য রাজপরিবারের তহবিল খরচ হলো—এ নিয়ে বর্তমান রাজা চার্লসের প্রশাসন নতুন করে চাপে পড়বে। বিবিসি এই বিষয়ের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করলে রাজপরিবার বা বাকিংহাম প্যালেস থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রাসঙ্গিক সূত্র মতে, সাধারণত রাজকীয় প্রাসাদে দর্শকদের নামের তালিকা থাকলেও অতি গোপনীয় বা ব্যক্তিগত ভ্রমণে আসা অতিথিদের নাম গোপন রাখা হতে পারে।
ভার্জিনিয়া জিউফ্রে এবং অ্যান্ড্রুর পতনের ইতিহাস
এটি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের বিরুদ্ধে প্রথম যৌন অভিযোগ নয়। এর আগে ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামক এক নারী অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ১৭ বছর বয়স থেকে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের মামলা করেছিলেন। জিউফ্রের অভিযোগ ছিল, ২০০১ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে লন্ডন, নিউইয়র্ক এবং এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে অ্যান্ড্রু তাকে তিনবার যৌন সম্পর্কের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। ২০২১ সালে করা সেই মামলায় ২০২২ সালে বিশাল অংকের বিনিময়ে আদালতের বাইরে রফা করেছিলেন অ্যান্ড্রু। জানা যায়, রাজকীয় ভাবমূর্তি রক্ষায় সেই সময় আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের সমঝোতায় জিউফ্রেকে সন্তুষ্ট করা হয়েছিল।
তবে গত বছর এই ঘটনায় নাটকীয় মোড় নেয় যখন ভার্জিনিয়া জিউফ্রের একটি মরণোত্তর স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থে তিনি জেফরি এপস্টেইন এবং রাজপরিবারের আরও অন্ধকার রহস্য তুলে ধরেন। এরপরই জিউফ্রের আত্মহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়। জিউফ্রের আইনজীবীরা অভিযোগ করে আসছেন যে, ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে তীব্র চাপের মুখে পড়েই তিনি চরম পথ বেছে নিয়েছিলেন।
রাজা চার্লসের কঠোর সিদ্ধান্ত ও বর্তমান অবস্থা
ভাইয়ের এমন একের পর এক যৌন কেলেঙ্কারির তথ্য সামনে আসায় তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ সম্রাট রাজা তৃতীয় চার্লস। ইতিপূর্বে রাজকীয় বিভিন্ন খেতাব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও, গত বছর জিউফ্রের নতুন তথ্যের প্রেক্ষিতে তাঁর ‘প্রিন্স’ (Prince) উপাধি, এইচআরএইচ (HRH) স্ট্যাটাস এবং সমস্ত সামরিক সম্মান চিরতরে কেড়ে নেওয়া হয়। এখন থেকে তিনি রাজপরিবারের সাধারণ সদস্য বা ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর’ হিসেবে পরিচিত।
বর্তমান রাজা চার্লস নির্দেশ দিয়েছেন যে, অ্যান্ড্রুকে অতি দ্রুত তাঁর বর্তমান বাসভবন রয়েল লজ ছেড়ে চলে যেতে হবে। তিনি ২০০৪ সাল থেকে এই সুবিশাল ও ব্যয়বহুল উইন্ডসর এস্টেটে বসবাস করছেন। তবে অভিযোগকারী নতুন এই নারীর আইনজীবী জানিয়েছেন যে, খেতাব বাতিলের পর অ্যান্ড্রুর আইনজীবীদের সঙ্গে তাঁদের আর যোগাযোগ হচ্ছে না।
জেফরি এপস্টেইন সংযোগ এবং গ্লোবাল সিন্ডিকেট
অ্যান্ড্রুর বর্তমান আইনি সমস্যার মূলে রয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বন্ধু জেফরি এপস্টেইন। মার্কিন এই ফিনান্সিয়ার নাবালিকা ও কিশোরীদের যৌন বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক চক্র চালাতেন, যেখানে অনেক ক্ষমতাধর বিশ্বনেতা ও শিল্পপতির আনাগোনা ছিল বলে দাবি করা হয়। এপস্টেইন ২০০৮ সালে প্রথম দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে মার্কিন কারাগারে বিচার চলাকালে তাঁর রহস্যময় মৃত্যু ঘটে, যা ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা হিসেবে দাবি করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর তৈরি ‘ডার্ক নেটওয়ার্ক’ থেকে একের পর এক প্রভাবশালীর নাম বেরিয়ে আসছে, যার মধ্যে অ্যান্ড্রুর অবস্থান অত্যন্ত লজ্জাজনক।
বর্তমানে পুরো ঘটনাটি লন্ডন পুলিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগকারী নারীর জবানবন্দি এবং আইনি প্রক্রিয়া সামনে বাড়লে অ্যান্ড্রু কি ফের কোটি পাউন্ডের সমঝোতায় যাবেন নাকি তাঁর ভাগ্যে জেলহাজত জুটবে—তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ এখন অ্যান্ড্রুকে বিচারের আওতায় আনার জন্য লন্ডনের রাজপথে বিক্ষোভও করছেন।
রাজপরিবারের আড়ালে চাপা থাকা এই লালসা আর কুশ্রী অধ্যায় রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে কতটুকু অন্ধকার করবে, সে প্রশ্নই এখন লন্ডন থেকে টেমস নদীর প্রতিটি বাঁকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
